ব্যঞ্জনধ্বনির উচ্চারণ শেখা হয়েছে। এবার স্বরধ্বনি — যেসব ধ্বনি উচ্চারণের সময় মুখের ভেতর বাতাস বাধা পায় না। অ, আ, ই, ঈ, উ, ঊ, ঋ, এ, ঐ, ও, ঔ — বাংলায় স্বরবর্ণ এগারোটি।
কিন্তু মজার কথা হলো, বর্ণ এগারোটি হলেও ধ্বনি এগারোটি নয় — কয়েকটি বর্ণের উচ্চারণ আসলে এক। আবার উল্টোটাও সত্যি: একটি বর্ণ (যেমন 'অ') দুরকম করে উচ্চারিত হতে পারে।
এই দুটো কথাই এই লেকচারের বিষয়।
| জোড়া | উচ্চারণে পার্থক্য |
|---|---|
| ই ↔ ঈ | নেই — 'দিন' আর 'দীন' একই শোনায় |
| উ ↔ ঊ | নেই — 'কুল' আর 'কূল' একই শোনায় |
বাংলায় হ্রস্ব-দীর্ঘের পার্থক্যটা কেবল বানানে, উচ্চারণে নয়। ঠিক যেমন ন ↔ ণ এবং ং ↔ ঙ-এর বেলায় দেখেছিলে।
তাহলে দীর্ঘ ঈ/ঊ শেখার দরকার কী? — বানানের জন্য। উচ্চারণ শুনে বানান বোঝা যাবে না, তাই বানান আলাদা করেই শিখতে হবে।
বাংলার সবচেয়ে গিরগিটি-স্বভাবের ধ্বনি হলো অ। এর দুটি রূপ —
| রূপ | কেমন শোনায় | উদাহরণ |
|---|---|---|
| বিবৃত অ (স্বাভাবিক) | মুখ একটু বেশি খোলা, স্পষ্ট 'অ' | অমল · কমল · ঘর |
| সংবৃত অ | মুখ কিছুটা গোল, প্রায় 'ও'-এর মতো | অতি → ওতি · মধু → মোধু |
| নিয়ম | উদাহরণ |
|---|---|
| পরের অক্ষরে ই-কার বা উ-কার থাকলে | অতি → ওতি · কবি → কোবি · মধু → মোধু · যদি → জোদি |
| পরের অক্ষরে য-ফলা বা ক্ষ থাকলে | অন্য → ওন্নো · লক্ষ্য → লোক্খো |
| শব্দের একেবারে শেষে 'অ' থাকলে | পদ্ম → পদ্দো · লক্ষ → লক্খো · মধ্য → মোদ্ধো |
শেষ সারিটা চেনা লাগছে? আগের লেকচারে ঠিক এই শব্দগুলোই দেখেছিলে — সেখানে ব্যঞ্জনের দ্বিত্ব শিখেছিলে, আর এখানে দেখছ শেষের 'অ' কেন 'ও'-এর মতো শোনায়।
উপরের কোনো শর্ত না থাকলে 'অ' স্বাভাবিকই থাকে —
অমল · অটল · কমল · চলন · ঘর · বল · জল
'ঋ' লেখা হয় স্বরবর্ণ হিসেবে, কিন্তু উচ্চারণে শোনায় 'রি'-এর মতো।
| শব্দ | উচ্চারণ |
|---|---|
| ঋতু | রিতু |
| ঋণ | রিন |
| ঋষি | রিশি |
এ দুটি আসলে দুটি ধ্বনি জোড়া লাগা:
| বর্ণ | ভেঙে দেখলে | উদাহরণ |
|---|---|---|
| ঐ | অ + ই | ঐক্য · বৈশাখ |
| ঔ | অ + উ | ঔষধ · নৌকা |
১. হ্রস্ব-দীর্ঘ নিয়ে ছড়া:
ই আর ঈ, উ আর ঊ — কানে সবই এক, পার্থক্যটা বানানে, উচ্চারণে নয় — খেয়াল রেখো ঠিক।
২. 'অ' সংবৃত হওয়ার সংকেত — ই, উ, য-ফলা, ক্ষ: এই চারটির কোনোটি পরে থাকলেই আগের 'অ' 'ও'-এর দিকে ঝুঁকে পড়ে। কবি (ই আছে) → কোবি · মধু (উ আছে) → মোধু · অন্য (য-ফলা) → ওন্নো
৩. জোড়া মিলিয়ে দেখো — একই 'ক', দুই উচ্চারণ:
| বিবৃত (স্বাভাবিক অ) | সংবৃত (ও-এর মতো) |
|---|---|
| কমল | কবি → কোবি |
| মহল | মধু → মোধু |
পার্থক্যটা পরের অক্ষরে — প্রথম কলামে ই/উ নেই, দ্বিতীয় কলামে আছে।
৪. ঋ মানেই 'রি' — ঋতু, ঋণ, ঋষি। বর্ণটা স্বরবর্ণের ঘরে বসলেও ধ্বনিটা 'রি'।
১) 'দিন' আর 'দীন' — উচ্চারণে পার্থক্য আছে কি? উত্তর: নেই। বাংলায় হ্রস্ব ই ও দীর্ঘ ঈ-এর উচ্চারণ একই। দুটো শব্দের অর্থ আলাদা (দিন = দিবস, দীন = গরিব), আর সেই অর্থ আলাদা করে বোঝাতেই বানান আলাদা। কিন্তু কানে দুটো একই শোনায়।
২) 'কবি' শব্দে প্রথম 'ক'-এর 'অ' কীভাবে উচ্চারিত হয়? উত্তর: সংবৃত, অর্থাৎ 'ও'-এর মতো — কোবি। কারণ পরের অক্ষরে ই-কার আছে। তুলনা করো 'কমল'-এর সঙ্গে — সেখানে পরে ই/উ নেই, তাই স্বাভাবিক 'অ'ই থাকে।
৩) 'অন্য' শব্দটির শুদ্ধ উচ্চারণ কী? উত্তর: ওন্নো। দুটো নিয়ম একসঙ্গে খাটছে — (ক) পরে য-ফলা আছে বলে শুরুর 'অ' সংবৃত হয়ে 'ও' হয়েছে, আর (খ) য-ফলা মাঝে বসায় আগের 'ন' দ্বিগুণ হয়েছে (আগের লেকচারের নিয়ম)।
৪) 'ঋতু' শব্দটির শুদ্ধ উচ্চারণ কী? উত্তর: রিতু। 'ঋ' স্বরবর্ণ হলেও উচ্চারণে 'রি'-এর মতো শোনায়। "ঋ-তু" আলাদা করে বলার চেষ্টা কোরো না।
৫) 'পদ্ম' শব্দের শেষে তো কোনো স্বরচিহ্ন নেই — তবু 'ও' শোনা যায় কেন? উত্তর: বাংলা শব্দের শেষে অদৃশ্য একটি 'অ' থেকে যায়, আর শব্দের শেষে সেই 'অ' সংবৃত হয়ে 'ও'-এর মতো শোনায়। তাই পদ্দো। একই কারণে লক্ষ → লক্খো, মধ্য → মোদ্ধো।
১. হ্রস্ব-দীর্ঘকে উচ্চারণে আলাদা করার চেষ্টা। "নদী"-কে টেনে "নদীইই" বলা ভুল। উচ্চারণে ই আর ঈ এক — পার্থক্য শুধু বানানে।
২. উচ্চারণ শুনে হ্রস্ব-দীর্ঘ বানান ঠিক করা। কানে এক শোনায় বলেই "নদি" লেখা যাবে না — শুদ্ধ বানান নদী। এই টপিকের সবচেয়ে জরুরি সতর্কতা এটাই।
৩. সব 'অ'-কে এক রকম বলা। কমল আর কোবি — দুটোতেই প্রথমে 'অ', কিন্তু উচ্চারণ আলাদা। পরের অক্ষরে কী আছে, সেটা দেখতে হয়।
৪. 'ঋ'-কে আলাদা স্বর হিসেবে টেনে বলা। ঋতু = রিতু, "ঋ-তু" নয়।
৫. শব্দের শেষের 'অ' একেবারে গিলে ফেলা। পদ্দো-কে "পদ্দ" বলে থেমে যাওয়া ঠিক নয় — শেষে হালকা 'ও' শোনা যায়।