০২. বাংলাদেশের ইতিহাস (প্রাচীন ও মধ্যযুগ)
মূল ধারণা
বাংলাদেশের ভূখণ্ডে সভ্যতার ইতিহাস হাজার বছরের পুরনো। প্রাচীনকালে এই অঞ্চল বিভিন্ন জনপদে বিভক্ত ছিল এবং বিভিন্ন রাজবংশ এখানে শাসন করেছে। মধ্যযুগে মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠিত হয় এবং স্থাপত্য, সংস্কৃতি ও বাণিজ্যে নতুন মাত্রা যোগ হয়। BCS ও চাকরি পরীক্ষায় প্রাচীন জনপদ, রাজবংশ, সুলতানি ও মুঘল আমলের প্রশ্ন নিয়মিত আসে।
বিস্তারিত তথ্য ও তালিকা
প্রাচীন জনপদসমূহ
প্রাচীন বাংলা কোনো একক রাষ্ট্র ছিল না। একে কয়েকটি জনপদ (ক্ষুদ্র রাজ্য) বলা হতো:
| জনপদ |
বর্তমান অবস্থান |
বিশেষ তথ্য |
| পুণ্ড্রবর্ধন |
বগুড়া-রাজশাহী-দিনাজপুর |
রাজধানী: পুণ্ড্রনগর (মহাস্থানগড়) |
| বঙ্গ |
ঢাকা-বরিশাল-ফরিদপুর |
"বাংলা" নামের উৎপত্তি এখান থেকে |
| সমতট |
কুমিল্লা-নোয়াখালী |
বিখ্যাত বৌদ্ধ বিহার |
| হরিকেল |
সিলেট-চট্টগ্রাম |
পূর্বাঞ্চলীয় জনপদ |
| চন্দ্রদ্বীপ |
বরিশাল |
দ্বীপভূমি |
| গৌড় |
চাঁপাইনবাবগঞ্জ-মালদা |
পরবর্তীতে বাংলার রাজধানী |
| রাঢ় |
পশ্চিমবঙ্গের পশ্চিমাংশ |
বর্তমানে ভারতে |
| তাম্রলিপ্তি |
মেদিনীপুর (ভারত) |
প্রাচীন বন্দরনগরী |
প্রধান রাজবংশ (প্রাচীন যুগ)
মৌর্য বংশ (আনুমানিক খ্রি.পূ. ৩২৪-১৮৫):
- সম্রাট অশোক বাংলা অঞ্চলেও প্রভাব বিস্তার করেন
- মহাস্থানগড়ে (বগুড়া) মৌর্য শিলালিপি পাওয়া গেছে — বাংলাদেশের প্রাচীনতম শিলালিপি
গুপ্ত বংশ (আনুমানিক ৩২০-৫৫০ খ্রি.):
- সমুদ্রগুপ্তের এলাহাবাদ প্রশস্তিতে সমতট ও পুষ্করণার উল্লেখ
- "ভারতের স্বর্ণযুগ" বলা হয় গুপ্ত যুগকে
পাল বংশ (৭৫০-১১৬১ খ্রি.):
- প্রতিষ্ঠাতা: গোপাল (জনগণ কর্তৃক নির্বাচিত — অনন্য ঘটনা)
- শ্রেষ্ঠ শাসক: ধর্মপাল ও দেবপাল
- ধর্মপাল: বিক্রমশীলা ও সোমপুর বিহার (পাহাড়পুর) প্রতিষ্ঠা
- দেবপাল: সাম্রাজ্য সর্বোচ্চ বিস্তার
- ধর্ম: বৌদ্ধ ধর্মের পৃষ্ঠপোষক
- পাহাড়পুর (সোমপুর বিহার): UNESCO World Heritage Site, নওগাঁ জেলায়
সেন বংশ (১০৭০-১২৩০ খ্রি.):
- প্রতিষ্ঠাতা: হেমন্তসেন, তবে প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা বিজয়সেন
- বিজয়সেন: বিজয়পুর (মুন্সীগঞ্জ) রাজধানী, নবদ্বীপও রাজধানী ছিল
- বল্লালসেন: সমাজে কুলীন প্রথা প্রবর্তন, "দানসাগর" ও "অদ্ভুতসাগর" গ্রন্থ রচনা
- লক্ষ্মণসেন: সেন বংশের শেষ শক্তিশালী রাজা, রাজসভায় জয়দেব (গীতগোবিন্দ), ধোয়ী, গোবর্ধন আচার্য, শরণ, উমাপতিধর — "পঞ্চরত্ন"
- ধর্ম: হিন্দু ধর্মের পৃষ্ঠপোষক
মধ্যযুগ — মুসলিম শাসন
সুলতানি আমল:
- বখতিয়ার খলজি (১২০৪): তুর্কি সেনাপতি, মাত্র ১৭ জন অশ্বারোহী নিয়ে লক্ষ্মণসেনকে পরাজিত করেন (নদীয়ায়)। নালন্দা ও বিক্রমশীলা বিহার ধ্বংস।
- ফখরুদ্দিন মুবারক শাহ: বাংলার প্রথম স্বাধীন সুলতান (সোনারগাঁও কেন্দ্র করে)
- শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহ: সমগ্র বাংলার প্রথম স্বাধীন সুলতান, "শাহ-ই-বাঙ্গালা" উপাধি। এখান থেকেই "বাঙ্গালা" নামটি জনপ্রিয় হয়।
- হোসেন শাহ (১৪৯৩-১৫১৯): স্বাধীন সুলতানদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ বলে বিবেচিত। সাহিত্যের পৃষ্ঠপোষক।
- খান জাহান আলী: বাগেরহাটের ষাট গম্বুজ মসজিদ নির্মাতা (UNESCO World Heritage Site)
মুঘল আমল:
- ঢাকা রাজধানী: সুবাদার ইসলাম খান চিশতি ঢাকাকে সুবা বাংলার রাজধানী করেন (১৬১০)। নাম রাখেন "জাহাঙ্গীরনগর"।
- শায়েস্তা খান: ঢাকার লালবাগ কেল্লা (আদি নাম: কেল্লা আওরঙ্গবাদ) নির্মাণ শুরু করেন আজম শাহ, সম্পন্ন হয়নি। শায়েস্তা খানের আমলে চট্টগ্রাম বিজয় (১৬৬৬)। তাঁর শাসনামলে "টাকায় ৮ মণ চাল" — সমৃদ্ধির প্রবাদ।
- মুর্শিদকুলি খান: রাজধানী মুর্শিদাবাদে স্থানান্তর
গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান
| স্থান |
অবস্থান |
বিশেষত্ব |
| মহাস্থানগড় |
বগুড়া |
বাংলাদেশের প্রাচীনতম নগর (পুণ্ড্রনগর) |
| পাহাড়পুর |
নওগাঁ |
সোমপুর মহাবিহার, UNESCO Heritage |
| ময়নামতি/লালমাই |
কুমিল্লা |
শালবন বিহার, বৌদ্ধ সভ্যতা |
| সোনারগাঁও |
নারায়ণগঞ্জ |
মধ্যযুগে বাংলার রাজধানী |
| ষাট গম্বুজ মসজিদ |
বাগেরহাট |
খান জাহান আলী, UNESCO Heritage |
| উয়ারী-বটেশ্বর |
নরসিংদী |
২৪০০+ বছরের পুরনো নগর |
পরীক্ষায় বারবার আসা তথ্য
- পাল বংশের প্রতিষ্ঠাতা গোপাল — জনগণ কর্তৃক নির্বাচিত
- বখতিয়ার খলজি ১২০৪ সালে বাংলা জয় করেন
- ষাট গম্বুজ মসজিদ — বাগেরহাট, UNESCO Heritage
- ঢাকার নাম জাহাঙ্গীরনগর রাখেন ইসলাম খান (১৬১০)
- প্রাচীনতম নগর: মহাস্থানগড় (বগুড়া)
- সেন বংশের শেষ রাজা লক্ষ্মণসেন, তাঁর রাজসভায় "পঞ্চরত্ন"
সমাধান উদাহরণ (MCQ)
১. পাল বংশের প্রতিষ্ঠাতা কে?
(ক) ধর্মপাল (খ) দেবপাল (গ) গোপাল (ঘ) মহীপাল
উত্তর: (গ) গোপাল
ব্যাখ্যা: গোপাল ছিলেন পাল বংশের প্রতিষ্ঠাতা (৭৫০ খ্রি.)। তিনি জনগণ কর্তৃক নির্বাচিত প্রথম রাজা — ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাসে এটি এক অনন্য ঘটনা। ধর্মপাল ও দেবপাল ছিলেন শ্রেষ্ঠ শাসক।
২. বাংলাদেশের প্রাচীনতম নগর কোনটি?
(ক) সোনারগাঁও (খ) পাহাড়পুর (গ) মহাস্থানগড় (ঘ) ময়নামতি
উত্তর: (গ) মহাস্থানগড়
ব্যাখ্যা: বগুড়ার মহাস্থানগড় (প্রাচীন পুণ্ড্রনগর) বাংলাদেশের সবচেয়ে প্রাচীন নগর। এখানে মৌর্য যুগের ব্রাহ্মী লিপির শিলালিপি পাওয়া গেছে।
৩. ঢাকাকে সুবা বাংলার রাজধানী করেন কে?
(ক) শায়েস্তা খান (খ) ইসলাম খান (গ) মুর্শিদকুলি খান (ঘ) আলীবর্দী খান
উত্তর: (খ) ইসলাম খান
ব্যাখ্যা: ১৬১০ সালে মুঘল সুবাদার ইসলাম খান চিশতি ঢাকাকে সুবা বাংলার রাজধানী করেন এবং সম্রাট জাহাঙ্গীরের সম্মানে নাম রাখেন "জাহাঙ্গীরনগর"।
৪. ষাট গম্বুজ মসজিদ কোথায় অবস্থিত?
(ক) রাজশাহী (খ) খুলনা (গ) বাগেরহাট (ঘ) সিলেট
উত্তর: (গ) বাগেরহাট
ব্যাখ্যা: বাগেরহাটের ষাট গম্বুজ মসজিদ ১৫শ শতকে খান জাহান আলী নির্মাণ করেন। এটি UNESCO বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান (১৯৮৫)। মূলত ৭৭টি গম্বুজ আছে।
৫. বাংলায় মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠিত হয় কত সালে?
(ক) ১১৭১ (খ) ১২০৪ (গ) ১৫২৬ (ঘ) ১৭৫৭
উত্তর: (খ) ১২০৪
ব্যাখ্যা: ১২০৪ সালে তুর্কি সেনাপতি ইখতিয়ারউদ্দিন মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার খলজি নদীয়ায় সেন রাজা লক্ষ্মণসেনকে পরাজিত করে বাংলায় মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠা করেন।
সতর্ক থাকুন — Common Mistakes
- সেন বংশের প্রতিষ্ঠাতা: হেমন্তসেন (প্রকৃত), কিন্তু অনেক বইতে বিজয়সেন লেখা থাকে। প্রশ্নে "প্রকৃত/প্রতিষ্ঠাতা" থাকলে হেমন্তসেন, "স্বাধীন/শক্তিশালী" থাকলে বিজয়সেন।
- ষাট গম্বুজ vs ৭৭ গম্বুজ: নাম "ষাট" হলেও আসল গম্বুজ সংখ্যা ৭৭ (ছাদে ৭৭ বা ৮১ — বিভিন্ন উৎসে ভিন্ন)।
- পাহাড়পুর নওগাঁতে, নারায়ণগঞ্জে না: এই জেলা গুলিয়ে যায় অনেকের।
- ফখরুদ্দিন vs ইলিয়াস শাহ: ফখরুদ্দিন "সোনারগাঁওয়ের" প্রথম স্বাধীন সুলতান, ইলিয়াস শাহ "সমগ্র বাংলার" প্রথম স্বাধীন সুলতান।
মনে রাখার শর্টকাট
- পাল বংশ = বৌদ্ধ, সেন বংশ = হিন্দু (পা-বৌ, সে-হি)
- "গো-ধর্ম-দে" → গোপাল > ধর্মপাল > দেবপাল (পাল বংশ ক্রম)
- "বখতিয়ার ১২০৪" → বখ = বারো (১২), তিয়ার = চার (০৪)
- "ইসলাম-জাহাঙ্গীর-ঢাকা-১৬১০" → ১৬১০ = ষোলশ দশ
- "মহাস্থান-মহাপুরনো" → মহাস্থানগড় = প্রাচীনতম
- "পুণ্ড্র-পাণ্ডু-বগুড়া" → পুণ্ড্রবর্ধন জনপদ = বগুড়া