আমি যদি ১৯৭১ সালে থাকতাম...
"আমি যদি ১৯৭১ সালে থাকতাম..."
রাতে ছাদে দাঁড়িয়ে আকাশ দেখার একটা অদ্ভুত অভ্যাস আছে আমার। শহরের আলোয় তারা খুব বেশি দেখা যায় না, তবুও আমি তাকিয়ে থাকি। মাঝে মাঝে ভাবি—এই একই আকাশ কি ১৯৭১ সালেও এমনই ছিল? চাঁদ কি তখনও এভাবেই উঠতো? বাতাস কি তখনও এমনই বইতো? নাকি তখন বাতাসেও থাকতো বারুদের গন্ধ?
—আমি যদি ১৯৭১ সালে থাকতাম, তাহলে কী করতাম?
সৎভাবে বলতে গেলে, হয়তো প্রথমে ভয় পেতাম। অনেক ভয়। আমি কল্পনা করি—
১৯৭১ এর মার্চের শেষভাগের একটি নিস্তব্ধ রাত। আমি হয়তো ঘুমিয়ে থাকতাম, একটা ছোট্ট ঘরে। হঠাৎ দূর থেকে গুলির শব্দ আসতো— একটা না, পরপর অনেকগুলো।
আতঙ্কে হয়তো আঁতকে উঠতাম। বুকটা ভয়ে চেপে ধরতো। মা হয়তো ছুটে আসতেন ঘরে। তাঁর চোখেও ঘুম থাকতো না, থাকতো একটা অদ্ভুত আতঙ্ক — যে আতঙ্ক ভাষায় বোঝানো যায় না, শুধু মায়েরাই বোঝেন। তিনি হয়তো কিছু বলতেন না। শুধু আমার হাতটা শক্ত করে ধরতেন।
বাইরে তখন পাকিস্তানি আর্মি নামতো রাস্তায়। বাড়িঘর, দোকানপাটে আগুন লাগাতো। মানুষ মারতো ঘুমের মধ্যেই, নিরস্ত্র অবস্থায়।
আমি জানালার ফাঁক দিয়ে দেখতাম — রাস্তায় একটা লাশ পড়ে আছে। চেনা মুখ। পাশের বাড়ির রিকশাওয়ালা মামা, যিনি প্রতিদিন সকালে দেখা হলে আমার সাথে হাসিমুখে কথা বলতেন।
তার কিছুদিন পর, রাস্তা দিয়ে হাঁটার সময় দেখতাম—আমারই বয়সী এক ছেলের নিথর দেহ পড়ে আছে। তার চোখ দুটো খোলা। যেন আকাশের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করছে—“আমার অপরাধ কী ছিল?” তার গায়ের শার্টে লাল দাগ। সেই লাল রং হয়তো আমার ভেতরের দ্বিধাগুলো ধুয়ে দিত। সেই মুহূর্তে হয়তো ভয়টা একটু সরে যেত। জায়গা নিত অন্য কিছু — এক জ্বলন্ত রাগ। বুকের গভীরে।
এপ্রিলের শুরুতে হয়তো খবর আসতো — গ্রামে গ্রামে মিলিশিয়া তৈরি হচ্ছে। মুক্তিযোদ্ধারা সংগঠিত হচ্ছে। ভারতে ট্রেনিং ক্যাম্প বসছে।
বন্ধু সবুজ এসে বলতো, "চল যাই।"
আমি হয়তো সাথে সাথে হ্যাঁ বলতে পারতাম না। মা-বাবা আছেন। ছোট বোনটা আছে।
রাতে মায়ের সাথে কথা বলতাম। তিনি অনেকক্ষণ চুপ থাকতেন। তারপর হয়তো বলতেন, "তুই না গেলে এই দেশ কে রক্ষা করবে, বাবা?"
মায়েদের সাহস সন্তানের চেয়ে অনেক বেশি হয়। এটা সেদিন বুঝতাম।
পরদিন ভোরে বের হতাম। মায়ের কাঁধে মাথা রেখে বলতাম, “আমি যাচ্ছি।” মা তখন কিছু বলতেন না, একদম নিশ্চুপ। শুধু আমার চুলে হাত বুলিয়ে দিতেন। সেই স্পর্শে থাকত ভয়, আশীর্বাদ আর এক অদ্ভুত শক্তি। বাবাও চুপচাপ বাইরে তাকিয়ে থাকতেন। তাঁর চোখে জল থাকলেও তিনি তা দেখাতেন না। কারণ সেই সময় পুরুষদের কাঁদার অধিকারও যেন সীমিত ছিল। আমি হয়তো একবার ফিরে তাকাতাম। সবার চোখ ভেজা, কিন্তু ঠোঁটে একটা শক্ত রেখা।
তাঁদের মুখটা জীবনেও ভুলতাম না।
ট্রেনিং শেষে দেশে ফিরে আসতাম। একটা পুরনো রাইফেল হাতে। হাতে যতটা না শক্তি, বুকে তার চেয়ে বেশি।
এরপর একটা অপারেশনে অংশ নিতাম — একটা সেতু উড়িয়ে দেওয়ার কাজ। রাত তখন গভীর। আমরা হয়তো পাঁচজন থাকতাম। অন্ধকারে হামাগুড়ি দিয়ে এগোতাম।
হঠাৎ পাকসেনার টর্চের আলো।
আমার পাশের সাথী আমার সেই বন্ধু সবুজ— সে আমাকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে নিজে উঠে দাঁড়াতো। গুলির শব্দ হতো এবং সে তার বুকের তাজা রক্ত দিয়ে দেশের ঋণ শোধ করতো। আমি হয়তো তার হাত ধরে বসে থাকতাম কিছুক্ষণ। মনে হতো, সে এখনো কিছু বলতে চাইছে। তার শেষ কথা হতো—“দেশটা যেন স্বাধীন হয়…”
আমি সেই কথা নিজের ভেতরে জমিয়ে রাখতাম। সেদিন থেকে আমার প্রতিটি গুলির শব্দে, প্রতিটি পদক্ষেপে যেন সবুজের স্বপ্নও আমার সাথে এগোচ্ছিল।
আমরা বাকিরা মিলে শেষ করতাম। সেতু ধ্বংস হতো। পাকবাহিনীর রসদ সরবরাহ বন্ধ হতো সেই রুটে।
কিন্তু ফেরার পথে সবুজকে কাঁধে বহন করতাম। ওর ঠান্ডা শরীর। হয়তো কাঁদতাম না সেদিন। কান্না আসত না। ভেতরে একটা পাথর বসে যেত।
১৬ই ডিসেম্বর। বিকেলের দিকে খবর আসত — পাকবাহিনী আত্মসমর্পণ করেছে।
আমি হয়তো তখন একটা গ্রামের মাঠে বসে থাকতাম। পায়ে ক্লান্তি, চোখে ঘুম নেই অনেকদিন, গায়ে পুরনো জামা।
খবরটা শুনে হয়তো প্রথমে বিশ্বাস হত না।তারপর একে একে অনেকেই বলার পর বিশ্বাস করতাম এবং আমিও তাদের সাথে চিৎকার দিয়ে উঠতাম। চিৎকারটা বুক ফেটে বের হয়ে আসতো। নয় মাসের জমানো কষ্ট, সবুজের মুখ, মায়ের সেই ভেজা চোখ — সব একসাথে গলা দিয়ে বের হতে চাইতো।
প্রথমবার আমার চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়তো। এবার বাড়ি ফেরার পালা।
বাড়ি হয়তো ফিরতাম অনেক দিন পর। দরজায় দাঁড়াতাম। মা ভেতরে রান্না করছেন। ডাল রান্নার গন্ধ। তিনি বের হয়ে আসতেন। আমাকে দেখতেন। কিছু বলতেন না। শুধু বুকে জড়িয়ে ধরতেন।
আমি মায়ের কাঁধে মাথা রেখে দাঁড়িয়ে থাকতাম। ১৯ বছর বয়সী একটা ছেলে, যে একটা যুদ্ধ পার করে এসেছে, সে তখন আবার ছোট্ট হয়ে যেত।
বুকে একটা ক্ষত থাকত — দেখা যেত না, কিন্তু সারাজীবন থাকতো। বন্ধু সবুজের স্মৃতি, সেই রাতের অন্ধকার, মায়ের সেই দরজায় দাঁড়িয়ে থাকা — এগুলো কোনোদিন মুছত না। কিন্তু বুকে আরেকটা জিনিসও থাকত। গর্ব।
আমি জানি না, সত্যিকারের সেই সময়ে আমি কতটা সাহসী হতাম। হয়তো কোথাও লুকিয়ে থাকতাম। হয়তো ভয়ে হাত কাঁপতো। হয়তো মায়ের কথা মনে পড়ত বারবার আর পা দুটো এগোতে চাইতো না। হয়তো আমার নাম ইতিহাসের পাতায় থাকতো না। আমি হয়তো কোনো বড় নেতা হতাম না। কিন্তু যদি আমার ছোট্ট অবদানও এই দেশের স্বাধীনতার ভোরে এক ফোঁটা আলো যোগ করতো— এটাই কি যথেষ্ট নয়?
আজ আমি স্বাধীন দেশে জন্মেছি। স্কুলে গিয়ে জাতীয় সংগীত গাইতে পারি। নিজের ভাষায় কথা বলতে পারি। মত প্রকাশ করতে পারি। এই সাধারণ অধিকারগুলোই আসলে অসাধারণ ত্যাগের ফল।
তাই মাঝে মাঝে নিজেকে প্রশ্ন করি—আমি কি সত্যিই সেই ত্যাগের যোগ্য নাগরিক হতে পেরেছি?
আজ ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে আমি বুঝি—যুদ্ধের রক্তক্ষয় শেষ হয়েছে, কিন্তু লড়াই শেষ হয়নি। এখন আমাদের লড়াই দুর্নীতির বিরুদ্ধে, বিভাজনের বিরুদ্ধে, অসচেতনতার বিরুদ্ধে। প্রযুক্তি, শিক্ষা আর নৈতিকতার চ্যালেঞ্জ আমাদের সামনে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে। যদি ১৯৭১-এর মানুষরা জীবন দিয়ে দেশ রক্ষা করতে পারে, তাহলে আমরা কেন দায়িত্ব দিয়ে সেই দেশ গড়তে পারব না? তারা রক্ত দিয়ে স্বাধীনতা এনে দিয়েছিল। আর আমাদের কাজ হলো সেই স্বাধীনতাকে অর্থবহ করে তোলা। আজকের প্রজন্মকে প্রমাণ করতে হবে—আমরা শুধু ইতিহাস পড়ি না, ইতিহাসের মর্যাদাও রাখি।
Comments (0)
Login to leave a comment.