বাংলাদেশে হামের ভয়াবহ প্রকোপ: মাত্র ৫৫ দিনে ৪০০-রও বেশি শিশুর মৃত্যু

দেশজুড়ে হামের যে প্রাদুর্ভাব চলছে, তা এখন মহামারির রূপ নিয়েছে। গত আড়াই দশকে বাংলাদেশ এত বড় হামের ধাক্কা আর দেখেনি। কেবল শিশুরাই আক্রান্ত হচ্ছে না — প্রতিদিন নতুন নতুন শিশু মারা যাচ্ছে। এই সংকটের পেছনে কী কারণ, পরিস্থিতি কতটা গুরুতর, আর আমাদের করণীয় কী — সেটাই আজ তুলে ধরা হলো।
মৃত্যুর মিছিল থামছে না
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চ ২০২৬ থেকে মাত্র ৫৫ দিনে সারাদেশে হাম ও হামের উপসর্গে ৪১৫ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে নিশ্চিতভাবে হামে মারা গেছে ৬৫ জন, বাকি ৩৫০ জনের মৃত্যু হয়েছে হামের উপসর্গ নিয়ে।
৪ মে একদিনেই মারা গেছে ১৭ শিশু — এটি এই প্রাদুর্ভাবে একদিনে সর্বোচ্চ মৃত্যু।
সন্দেহভাজন আক্রান্তের সংখ্যা ছাড়িয়েছে ৫১ হাজার ৫৬৭ জন, যা গত আড়াই দশকের সব রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে। এর মধ্যে ল্যাবরেটরিতে নিশ্চিত হামে আক্রান্ত ৭ হাজারেরও বেশি।
কেন এত ভয়াবহ হলো?
বিশেষজ্ঞরা এই মহামারির পেছনে মূলত তিনটি কারণ চিহ্নিত করেছেন:
১. টিকার জাতীয় ঘাটতি (২০২৪-২৫ সাল)
২০২৪ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে সারাদেশে এমআর (হাম-রুবেলা) টিকার মজুত শেষ হয়ে যায়। ফলে টিকার প্রথম ও দ্বিতীয় ডোজের কভারেজ — উভয়ই — মারাত্মকভাবে কমে যায়।
২. ক্যাম্পেইন বন্ধ ২০২০ সাল থেকে
২০২০ সালের পর থেকে দেশব্যাপী কোনো নিয়মিত সম্পূরক হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি আর পরিচালিত হয়নি। এই দীর্ঘ বিরতিতে বিশাল একটি “ইমিউনিটি গ্যাপ” তৈরি হয়ে যায়।
৩. দেরিতে হাসপাতালে আসা
হামের কোনো অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ নেই। হাম থেকে নিউমোনিয়া হলে পরিস্থিতি জটিল হয়ে পড়ে। কিন্তু অনেক শিশুকে গুরুতর জটিলতা হওয়ার পরই হাসপাতালে আনা হচ্ছে, তখন লাইফ সাপোর্টেও বাঁচানো সম্ভব হচ্ছে না।
WHO কী বলছে?
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) বাংলাদেশের বর্তমান হামের ঝুঁকিকে জাতীয় পর্যায়ে “উচ্চ” এবং আঞ্চলিক পর্যায়েও “উচ্চ” হিসেবে মূল্যায়ন করেছে।
সংস্থাটি জানিয়েছে, দেশের প্রায় ৯১ শতাংশ জেলা এখন হামের কবলে। ভারত ও মিয়ানমারের সাথে দীর্ঘ সীমান্ত থাকায় আন্তঃসীমান্ত সংক্রমণের ঝুঁকিও প্রবল। বিশেষত সীমান্তবর্তী যশোর ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় সংক্রমণ বেশি। ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট ও কক্সবাজার থেকে বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় বৈশ্বিক ঝুঁকি “মাঝারি” ধরা হয়েছে।
সরকারের পদক্ষেপ
পরিস্থিতি সামলাতে সরকার কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। ন্যাশনাল ইমিউনাইজেশন টেকনিক্যাল অ্যাডভাইজরি গ্রুপ (NITAG) টিকা দেওয়ার বয়স ৯ মাস থেকে কমিয়ে ৬ মাস করার সুপারিশ করেছে, কারণ আক্রান্তদের এক-তৃতীয়াংশই ৯ মাসের কম বয়সী। দেশব্যাপী বিশেষ টিকাদান কর্মসূচিও চালু হচ্ছে।
আপনি কী করবেন?
শিশুর বয়স অনুযায়ী হামের টিকা দিন, নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে খোঁজ নিন
জ্বর, গায়ে র্যাশ বা চোখ লাল হলে দেরি না করে চিকিৎসকের কাছে যান
পরিবার ও প্রতিবেশীদের সচেতন করুন
তথ্যসূত্র
এই প্রতিবেদনটি নিচের বিশ্বস্ত সংবাদমাধ্যম ও সংস্থার তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি:
১. প্রথম আলো — হামে ৪০০ ছাড়াল: https://www.prothomalo.com/bangladesh/nljqs8n2tt ২. প্রথম আলো — WHO রিপোর্ট: https://www.prothomalo.com/bangladesh/f3vob9gxnr ৩. বিডিনিউজ২৪ — ৫৫ দিনে ৪০৯ শিশুর মৃত্যু: https://bangla.bdnews24.com/bangladesh/68973fabf2f9 ৪. ঢাকা ট্রিবিউন — ৪১৫ শিশুর মৃত্যু: https://bangla.dhakatribune.com/bangladesh/102731 ৫. ঢাকা ট্রিবিউন — একদিনে সর্বোচ্চ ১৭ মৃত্যু: https://bangla.dhakatribune.com/bangladesh/102407 ৬. ইত্তেফাক — সরকারি তথ্যেই ৪০৯ শিশুর মৃত্যু: https://www.ittefaq.com.bd/788261 ৭. TBS News — WHO উচ্চ ঝুঁকির সতর্কতা: https://www.tbsnews.net/bangla/bangladesh/news-details-482446 ৮. The Daily Star (Bangla) — ৬ মাসে টিকার সুপারিশ: https://bangla.thedailystar.net/health/disease/news-3912166
এই পোস্টটি সচেতনতামূলক উদ্দেশ্যে প্রকাশিত। চিকিৎসাবিষয়ক যেকোনো সিদ্ধান্তের জন্য বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
Comments (0)
Login to leave a comment.