বীরাঙ্গনা
“এই বৃষ্টি বাদলার দিনেই তোমাকে যেতে হবে? আমার না মন মানছে না, তুমি থেকে যাও না আমার কাছে, তোমার কিছু হয়ে গেলে…”
রেহেনা কথা শেষ করার আগেই রাজু তাকে বুকে নিলো। এই অমাবস্যার অন্ধকারে সবকিছুই যেনো আবছায়া,রেহেনার কান্না তার গাল বেয়ে রাজুর ঘাড়ে এসে পড়ছে। রাজু রেহেনার চোখের জল মুছে দিয়ে বললো,
“ এ কথা বলিও না রেহেনা, আমাকে যেতে দাও আমার মায়ের জন্য। সন্তান যদি তার মায়ের জন্য না যায়, তবে কে যাবে বলো? “
“তাহলে আমিও যাই তোমার সাথে, বাঁচলে একসাথে বাঁচবো, যদি মারা যাই তোমার সাথে শান্তির মৃত্যু কবুল করে নিবো।“ এ অন্ধকারেও রেহেনার চোখ জ্বলজ্বল করছিলো।
“এভাবে হয় না রেহেনা। যুদ্ধ তো শুধু মাঠে না, যুদ্ধ মনে, যুদ্ধ পরাধীনতাকে না মেনে নেওয়ার চেতনাতেই। তুমি এখানেই থাকো, তোমাকে আমার লাগবে, তুমি আমাকে তথ্য দিবে ,সাহস দিবে, এই স্বাধীনতাকে সকলের মাঝে ছড়িয়ে দিবে। পারবে না রেহেনা? পারবে না হাজারো রাজুর ভরসা হতে?
“কিন্তু…”
“কোনো কিন্তু না রেহেনা। আমার এখন যেতে হবে। আমি ফিরবো, আমি অবশ্যই ফিরবো তোমার কাছে, স্বাধীনতা নিয়েই ফিরবো।“
রাজু চলে গেলো, একটিবারও পেছনে ফিরে তাকালো না। তাকালো না বললে ভুল হবে, তাকাতে পারলো না, সে যে রেহেনাকে নিজের চেয়েও বেশি ভালোবাসে কিন্তু মায়ের ডাক তো অমান্য করা যায় না।
প্রায় তিন মাস অতিবাহিত হয়ে গেলো। রাজুর কোনো খোঁজ নেই।
“এতদিন হয়ে গেলো একবার দেখা তো করতে পারতো, দেখা না করুক একটা চিঠি তো লিখতে পারতো, চিঠি ডাকে পাঠাতে না পারুক আমার কথা ভেবে আকাশে উড়িয়ে দিতে তো পারতো, মেঘে মেঘে অবশ্যই চিঠিটা আমার কাছে আসতো। আসতো না কি? অবশ্যই আসতো।“
নিজের মনে হাজারো কথা ভেবে নিতে লাগলো রেহেনা। তার রাজুর কোনো খোঁজই যে তার নেই।
এমনই এক রাতে রাজুকে নিয়ে হাজারো অভিমানের হিসাব করছিলো রেহেনা। হঠাৎ তার দরজার সামনে কে যেনো তার নাম ধরে ডাকছে। গ্রামে মিলিটারিদের আনাগোনা ইতোমধ্যেই অনেক বেড়ে গেছে, কলেজ মাঠে নিয়মিত তাদের মহড়া বসে, যাকে পাচ্ছে তাকেই ধরে নিয়ে যাচ্ছে, অরাজকতায় যেনো সাধারণ ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে এই গ্রামে। এমন অবস্থায় রাতের বেলা কেউ ডাকতে আসা কখনোই সাধারণ কোনো ঘটনা নয়। এদিকে রেহেনার বাবা শহরে গেছে দুদিন হলো, বাড়ি ছেলে মানুষ বলতেই আছে একমাত্র ওর ছোট ভাই। এখন কারোর ডাকের জবাব দেওয়া কখনোই বুদ্ধিমানের কাজ হতে পারে না। রেহেনাও তাই করলো, চুপ থেকে বোঝার চেষ্টা করলো বাহিরে কে অবস্থান করছে।
নাহ, এই কন্ঠ একেবারেই নতুন রেহেনার কাছে।
কিছুক্ষণ সবকিছু শান্ত থাকার পর পায়ের আওয়াজ এগিয়ে আসতে থাকলো রেহেনার ঘরের জানালার দিকে। রেহেনা অনেক বেশি আতঙ্কিত, কি করবে সে?
“রেহেনা বুবু? আমি বক্কর ,রাজু ভাই আমারে পাঠাইছে, একটু দরজা খুলুন”
রাজুর নাম শুনে দ্বিতীয়বার কোনো চিন্তা না করেই দরজা খুলে দিলো রেহেনা।
রুগন চেহারার উস্কখুসকো চুল বক্করের, বয়স খুব বেশি না ১৯-২০ হবে। রেহেনাকে দেখেই উচ্ছ্বাসিত হয়ে সালাম দিলো বক্কর,
“সালামলাইকুম বুবু, আমি বক্কর, আপনার কথা খুব শুনছি ভাইজানের কাছ থেকে। আজ বিপদে পড়ে আপনার কাছে আসলাম। ভাই বলেই দিছিলো কোনো সমস্যা হলে আপনার কাছে আসতে”
“রাজু তোমাকে আমার কথা বলছে?” রেহানার উদগ্রীবতা তার কথাতেই বোঝা যাচ্ছিলো।
“জ্বী বুবু, রাতে যখন আমরা একসাথে ঘুমাইতে যাই, ভাইজান তো আপনাদের নিয়ে গল্প করেন, ভাইজান না বুবু খুবই ভালো মানুষ। দেশ স্বাধীন হইলেই যখন আপনারা বিয়ে করবেন ভাই বলছে, আমাকে বিয়ের সব দায়িত্ব দিয়ে দিবে। আমি সব সামলাবো একাই। বেশী দেরী নাই বুবু…”
রেহেনার চোখ দিয়ে পানি পড়ছে। রাজু এখনো তাকে নিয়ে ভাবে, তাকে নিয়ে স্বপ্ন বুনে, এর চেয়ে বেশি পাওয়া আর কি হতে পারে তার কাছে।
“কাইদেন না বুবু, ভাইজান খুব তাড়াতাড়িই আসবে এখানে। আমরা আগে আসছি আবহাওয়া দেখতে, ভাইরা আসলেই ফাইনাল খ্যালা শুরু। এখন শুধু আমাদের একটু সাহায্য করেন”
“হ্যাঁ, হ্যাঁ বলো তোমাদের কি লাগবে” রেহেনা খুব গম্ভীর হয়ে বললো।
“তেমন কিছু না বুবু, ঐ নদীপাড়ে আমরা ৭-৮ জন আছি। একটু ডাইল আর ভাত হইলেই হবে। যেই সকাল থেকে না খাওয়া আমরা। দিনের বেলা তো আসা যায় না, তাই এখন আসলাম আপনার কাছে।“
রেহেনা তার ঘরের মুড়ির টিন থেকে মুড়ি আর গুড় বের করে দিয়ে বক্করকে বললো,
“ ভাই তুমি এখন এই মুড়ি গুড় নিয়ে যাও ,তোমাদের অনেক খিদা লাগছে, আপতত এইটা খাও, আমি রান্না চড়াই দেই, কিছুটা বিশ্রাম নেওয়ার পর তোমরা এসে খেয়ে যাইও, আজকে এখানে খেয়ে যাও, কাল থেকে আমি ভুট্টোরে দিয়ে তোমাদের জন্য খাবার পাঠাইতে থাকবো”
“আচ্ছা বুবু ,আমি তাইলে এখন আসি। দু ঘন্টা পর আমরা এসে খেয়ে যাবো” রেহেনাকে আবারো সালাম দিয়ে বক্কর চলে গেলো।
বক্কর যাওয়ার পর রেহেনা তার মাকে ডেকে তুলে সব ঘটনা জানালো।
ঠিক ২ ঘন্টা পর বক্কর তার সাথীদের নিয়ে আসলো।
বক্করের সাথে আসলো ৭ জন ,বেশিরভাগই মাঝবয়সী, চেহারায় বিদ্রোহী ,বিদ্রোহী ছাপ, সকলের চোখই যেনো তৃষ্ণা, স্বাধীনতার তৃষ্ণা।
“বুবু, আপনার হাতের যে রান্না, মাশাআল্লাহ। রাজু ভাইজান খুব ভাগ্যবান”
“তাইলে আরেকটু ভাত দেই?
“না,না, বুবু অনেক খাইছি আর না“, বক্কর পেটের দিকে ইশারা করে বললো।
“তাইলে বোধ হয় মিথ্যা বললা তাই না? খাবার একটুও ভালো হয় নাই।“
“আরেহ বুবু, আচ্ছা দেন তাইলে আরেকটু”
রেহেনা মুচকি হাসলো।
“তোমরা আর কতদিন থাকবে এখানে?”
“আছি বুবু,যতদিন না আপনার চাল শেষ হয়” বক্করের উত্তর।
সবাই হাসিতে মেতে উঠলো।
হাসতে হাসতে হঠাৎ বক্করের চোখ মুখ গম্ভীর হয়ে গেলো।
“বুবু ঐ খানরা কলেজ মাঠে আছে তাই না?”
রেহেনা মাথা নাড়ালো।
“তুমি কি জানো ঐ কলেজের কোথায় কি আছে?”
“ জানবো না কেনো? আমি তো ওখানেই পড়তাম, সবকিছু হাতের তালুর মতো চিনি” হাতের দিকে তাকিয়ে একমনে বললো রেহেনা।
“তাইলে বুবু আমাদের একটা নকশা আঁকাই দাও”
রেহেনা মুচকি হাসল,
“চিন্তা করিও না বক্কর , আমি কালকেই মধ্যেই তোমাকে দিয়ে দিবো।“
বক্করের চোখে তাহেরার প্রতি শ্রদ্ধা স্পষ্ট ফুটে উঠেছে।
“তোমাকে যে কি বলে ধন্যবাদ দিবো বুবু…”
“ধন্যবাদ দিতে হবে না বক্কর। বিয়েতে শুধু দায়িত্ব ভালোভাবে পালন করিও তাইলেই হবে”
বক্কর তাহেরার পা ছুয়ে সালাম করলো,
“দোয়া করিও বুবু যেনো আমরা সফল হই”
খাওয়া শেষে বক্কররা তাদের আস্তানায় চলে গেলো।
সকলের চলে যাওয়ার পর রেহেনা তার কলেজের নকশা আঁকতে শুরু করলো, এতকিছুর ভিড়ে কখন যে সকাল হয়েছে আর ক্লান্ত হয়ে রেহেনা ঘুমিয়ে পড়েছে তা যে বুঝতেই পারলো না।
রেহেনার ঘুম ভাঙল হট্টগোলের আওয়াজে, তার মা চিৎকার করে কান্না করে কাকে কি যেনো বলছে। ঘুম চোখে রেহেনা ঘরের বাহিরে আসতেই দেখলো আহাদ রাজাকার তার বাড়িতে সাথে কয়েকজন খান সেনা।
“ এই যে মাগি সারারাত কুত্তাদের সাথে নষ্টামি করে ঘুম থেকে উঠলো। ধরে নিয়ে চল ওরে”
রেহেনার মা আহাদের পা ধরে কান্না শুরু করতে লাগলো,
“ বাচ্চা মেয়ে হুজুর ওরে মাফ কইরা দ্যান, বুঝে নাই। আমি ওরে আজকেই গ্রামছাড়া করবো। মাফ কইরা দেন হুজুর”
এ অবস্থা দেখে রেহেনা তার রুমে দৌড় দিতেই আহাদ রাজাকার তার পিছে গিয়ে চুলের মুথি ধরে তাকে টানতে টানতে বের করলো ।
চারিদিকে মানুষের ভীড়। সবাই তামাশা দেখছে, কারোর কিছু বলার সাহস নেই।
“পুইড়া দে ঐ মাগির বাড়ি, একটা কিছু আস্ত রাখবি না। গাদ্দারদের কোনো মাফ নাই।“
রেহেনাকে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যেতে যেতে তার বাড়িতে আগুন লাগিয়ে দিলো খান সেনারা।
এরপর চললো রেহেনার উপর পাশবিক নির্যাতন। একের পর এক পাক সেনা হায়নাদের মতো ঝাপিড়ে পড়লো রেহেনার উপর।লোলুপ দৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণের পর ভোগ্যপণ্যের মতো ভোগ করতে লাগলো রেহেনাকে।রেহেনার চোখের পানি গড়িয়ে গড়িয়ে ক্ষত স্থানে গিয়ে রেহেনাকে জানান দিচ্ছে তারা তার সবকিছু কেড়ে নিয়েছে তবুও মুক্তিযোদ্ধাদের সম্পর্কে বিন্দুমাত্র কোনো তথ্য তারা পেলো না। অবশেষে রেহেনার খোলস দেহকে ফেলে দেওয়া হলো অশান্ত নদীর তীরে।
সকাল বেলা। নির্মল স্নিগ্ধ বায়ু প্রবাহিত হচ্ছে। রেহেনার ক্ষত বিক্ষত দেহ পড়ে আছে কাদার মাঝে , নিশ্চল নির্বিঘ্নে। নদীপাড়ে শুভ্র কাশফুল দোলা খাচ্ছে। প্রকৃতিও যেনো তাদের মাঝে রেহেনাকে বরণ করে নিয়েছে। রেহানা আজ অনুভূতিহীন,তার নিশ্চল চোখ কাশের খেলা দেখছে। হয়তো অন্য সময় হলে সেও কাশসমুদ্রে মিলিয়ে দিত নিজেকে। কিন্তু আজ সে বীরাঙ্গনা, মায়ের জন্য নিজেকে সঁপে দিয়েছে। সর্বশক্তি দিয়ে হাতের মুঠোয় রেখে দিয়েছে কালকের আঁকা নকশা, এ নকশা যে রাজুকে দিতে হবে, এ নকশাই একদিন স্বাধীন বাংলাদেশের নকশাতে রূপান্তরিত হবে। রেহেনা হাসার চেষ্টা করলো, সে এখন রাজুর কাছে গর্ব করে বলতে পারবে সে দেশের জন্য কিছু হলেও করেছে।
রেহেনার চোখ দিয়ে জল পড়ছে। এ জল কি আনন্দের না রাজুকে দেখতে না পাওয়ার অনিশ্চয়তার বেদনার রেহেনা তা জানে না। রেহেনার চোখ বন্ধ হয়ে আসছে, হতে পারে এ নিদ্রায় তার শেষ নিদ্রা, হতে পারে আবার সে রাজুর বাহুতে নিজেকে খুঁজে পাবে। রেহেনা কিছুই জানে না, শুধু এটা জানে যে সে সৌভাগ্যবতী।
কারা যেনো রেহানার দিকে ছুটে আসছে, আবছা চোখে রেহেনা কিছু দেখতে পারছে না। সামনে কে ছুটে আসছে, রাজু?
Comments (0)
Login to leave a comment.