“বৈশাখের সেই সকাল”

গ্রামের নাম ছিল শিউলি-পাড়া। চারদিকে সবুজ ধানক্ষেত, কাঁঠাল গাছ আর মাটির ঘরের সারি। প্রতি বছর পহেলা বৈশাখ এলেই এই গ্রাম যেন নতুন করে জেগে উঠত।
রিমন, শহরে বড় হওয়া এক কিশোর, এবার প্রথমবারের মতো দাদুর বাড়িতে বৈশাখ উদযাপন করতে এসেছে। শহরের বৈশাখ মানে তার কাছে ছিল মেলা, পান্তা-ইলিশ আর কিছু রঙিন সাজসজ্জা। কিন্তু গ্রামে এসে সে বুঝতে পারল, বৈশাখ শুধু উৎসব নয়—এটা মানুষের মনের আনন্দ, ভালোবাসা আর ঐতিহ্যের মিলন।
ভোর হতেই গ্রামের মেয়েরা লাল-সাদা শাড়ি পরে উঠোনে আলপনা আঁকছিল। ছেলেরা নতুন পাঞ্জাবি পরে ঢোল বাজাতে শুরু করল। বাতাসে ভেসে আসছিল ভোরের গান—
“এসো হে বৈশাখ, এসো এসো…”
রিমন অবাক হয়ে দেখছিল সবকিছু। তার কাজিন মেহেদী তাকে বলল,
“এই যে, দাঁড়িয়ে আছ কেন? চল, মেলায় যাই!”
মেলায় গিয়ে রিমন দেখল কত রকমের দোকান—মাটির পুতুল, বাঁশের তৈরি খেলনা, আর নানা রকম মিষ্টি। এক কোণে বাউল গান গাইছে, অন্য পাশে নাগরদোলা ঘুরছে।
হঠাৎ সে দেখল এক বৃদ্ধ লোক মাটির হাঁড়ি বানাচ্ছেন। রিমন কাছে গিয়ে বলল,
“চাচা, এগুলো কি সব আপনার বানানো?”
বৃদ্ধ হাসলেন,
“হ্যাঁ বাবা, এই হাতেই বানাই। বৈশাখে মানুষ নতুন কিছু কিনে, তাই আমরাও নতুন আশা নিয়ে বসি।”
রিমনের মনে হল, শহরের চেয়ে গ্রামের বৈশাখ অনেক বেশি সত্যিকারের। এখানে মানুষ শুধু আনন্দ করে না, তারা নিজেদের সংস্কৃতি বাঁচিয়ে রাখে।
দুপুরে সবাই মিলে পান্তা-ভাত, ইলিশ মাছ আর কাঁচা মরিচ খেতে বসল। খেতে খেতে দাদু বললেন,
“বৈশাখ মানে শুধু খাওয়া-দাওয়া না, এটা আমাদের নতুন করে শুরু করার দিন।”
সন্ধ্যায় পুরো গ্রাম আলোয় ঝলমল করছিল। সবাই একসাথে গান গাইল, নাচল, হাসল। রিমন আকাশের দিকে তাকিয়ে ভাবল—
“এই আনন্দটা শহরে কেন পাই না?”
পরের দিন শহরে ফেরার সময় তার মন খারাপ হয়ে গেল। কিন্তু সে মনে মনে প্রতিজ্ঞা করল—
প্রতি বছর বৈশাখে সে এই গ্রামে ফিরবে।
কারণ সে বুঝে গেছে—
বৈশাখের আসল সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে মানুষের হৃদয়ে, আর সেই হৃদয় সবচেয়ে বেশি খুঁজে পাওয়া যায় গ্রামের সহজ-সরল জীবনে।
Comments (0)
Login to leave a comment.