চব্বিশের আগন্তুক
চব্বিশের আগন্তুক
–মুহাঃতাসদীকুল হক
আর দশটা দিনের মত সেদিনও বাড়ির সিঁড়িতে সেই ভাইয়ের সাথে দেখা। যদিও বেশিদিন হয় নি তাদের এই বাড়িতে ওঠা। মা ছাড়া কেউ নেই তার পরিবারে। টিউশনিতে রোজ যেত সাইকেল চালিয়ে। তবে সেদিন সে কিছুটা ক্লান্ত, কিছুটা ভীত, দম নিচ্ছে যেন একরাশ বাতাস একবারে টেনে নিচ্ছে। ঘরে ফিরেই দেখি এক ফেসবুক আইডি থেকে পোস্ট এসেছে, "জিরো পয়েন্ট পুলিশ ঘিরে রেখেছে।"
ভারী কামানের আওয়াজে তখন সারা দেশে কান পাতা দায়। ফেসবুকের রিলসের যুগে তখন মানুষ শেয়ার দিচ্ছে, " বুক পেতেছি, কর গুলি কর"। " পানি লাগবে কারো, ভাই পানি লাগবে?" ছেলেমেয়েরা লড়ছে অধিকার আদায়ের গল্পে। লাশ আর রক্তের বন্যা ঢাকা শহর ছাপিয়ে আছড়ে পড়েছে দেশের কোণায় কোণায়।
ঢাকা শহরে কোথায় পুলিশ এসেছে, কোথায় হামলা চলছে, মিনিটে মিনিটে পোস্ট আসে। এই রাজশাহীর বুকেও আগুন জ্বলেছিল। মিনিটে মিনিটে পোস্ট না আসলেও শহরের আপডেট নিয়ে মাঝে মাঝেই পোস্ট আসত। " পুলিশ রাবির প্রশাসন ভবন ঘিরে রেখেছে, টিয়ারশেল মারছে, ওদিকে পুলিশ দাঁড়ায় আছে, যাবেন না।"
রাতে বেলকনিতে দাঁড়িয়ে একটু শ্বাস নিচ্ছিলাম। দেখলাম কে যেন হন্তদন্ত হয়ে বের হয়ে যাচ্ছে। ল্যাম্পপোস্টের আলোয় ঠিক বুঝতে পারলাম না। পায়চারি করে ঘরে ফিরে এলাম। ঘুম আসে না আসে না করেও কিছুটা চোখ লেগে এসেছিল। চোখের পাতা খুলল গেট খোলার বিকট শব্দে। পুলিশ এসেছে। কাকে যেন খুঁজছে! বাবা-মা নেমে গেলেন কথা বলতে। ফিরে এলেন কিছু সময় পর। একটা ছেলের ফেসবুক আইডি দেখিয়ে বলছে চেনে নাকি? এড্রেস নাকি এখানেই দেখাচ্ছে। স্বাভাবিকভাবেই বাবা একটু ঘাবড়ে গিয়েছিল। মা নিজেই নাকি সামলিয়েছে। বলেছে কোন ছেলেই থাকে না বাসায়। কেউ আসলে জানাবে বলে মা ফোন নম্বরটাও নিয়ে রেখেছে তাদের।
কিছু পরেই আবার গেট খোলার শব্দ। তবে শব্দটা খুব মৃদু। জানলাতে চোখ লাগাতেই সেই ভাইয়ের দেখা। আলাপ ছিল না তেমন। বয়স সঠিক বলা যাচ্ছে না, তবে অনুমানে রক্তে আগুন লাগা টগবগে তরুণ। মা নিজেই গেল ছেলেটার সাথে কথা বলতে।
অবশ্য কিছুটা পরেই রাজশাহীর অবস্থা নিয়ে আবার আপডেট আসে। সেই একই আইডি থেকে। “সবকিছু থমথমে, রাবির বাইরে পুলিশ,ভেতরে ছাত্ররা আছে। দুজনকে ধরে নিয়ে গেছে।”
পরদিন সকালে আমাদের ঘরের দরজাটা খোলাই রেখেছিলাম। মা কতগুলো কাঠের বেশ শক্ত হাতল বের করে রেখেছিল। দুইটা বড় পানির বোতল ভরে রেখেছিলাম। সিঁড়িতে পায়ের আওয়াজ শুনেই তাকিয়ে থাকি। নাহ! ভাইটি নয়, উপরতলার কাজের মেয়েটা নামল। একটু পরেই ঝড়ের গতিতে কারো নেমে আসা! দরজার সামনে আসতেই মুখোমুখি। কিছুটা ভ্যাবাচেকা খেয়ে যায় সে। আমিও লজ্জার মাথা খেয়ে কাঠের হাতলগুলো এগিয়ে দিয়ে বললাম, “ এগুলোই ছিল। নিয়ে যান, যদি কিছু কাজে লাগে।” পানির বোতল এগিয়ে দিতেই বলল, “এগুলো লাগবে না! পানির ব্যবস্থা কিভাবে যেন হয়ে যায়!’’ “মার খাবেন না,ভাইয়া! আন্টির আর কেউ নাই তো!” ধরা গলায় উঠতি মেয়ের এমন আবেগ প্রবণ কথায় সে শুধুই পেছনে ফিরে হেসেছিল। ভাই কি জিনিস সেদিন প্রথম বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান হিসেবে অনুভব করেছিলাম! রক্তের না, তাও এত টান!
দেখতে দেখতে আজ পাঁচদিন হয়ে গেল। রাজনীতির উত্থান পতনে ছাত্ররা এগিয়ে গেল বিজয়ের পথে। যেদিন ছাত্ররা বিজয় আনতে ঢাকা শহর ঘেরাও করল “লং মার্চ টু ঢাকা”, সেদিনো রাজশাহী মেতেছিল একদল মানুষের ঢলে। তবে গুলি ঠিকই চলেছিল সেই বিজয়ের দিনে। নাম না জানা মানুষের ভিড়ে সে ভাইটিকেও দেখলাম রক্ত লেপে ঘুমিয়ে আছে। রাজশাহী মেডিকেলে লাশের ভিড়ে খুঁজে পাওয়া যায় তাকে। ভাইয়ের মা “আমি কার জন্য থেকে গেলাম। ওরা আমারে নিল না কেন?” ক্রন্দনে বোবা হয়ে গেল। রক্তের সম্পর্কে আবদ্ধ না হয়েও কিসের যেন টান লাগে আমার এই বুকে। মনে হয় এনজাইনা পেকটোরিস না তো আবার! কত মেয়ে স্বামী হারালো, কত সন্তান তার পিতাকে হারালো! আমার তো কেউ হারায় নি! আমি ভীরু কাপুরুষের মতই ঘরে থেকে নিজের কেউ নাহয়েও তাকে ভাই মেনেছি। নামাযে মনের অজান্তেই চোখে পানি আসে। বেঁচে থাকলে হয়তো বিয়ে করত, আচ্ছা উনার তো পছন্দের কেউ থাকতেই পারে! তাদের বাচ্চা হত, হয়তো আমি ফুফু হতাম! রক্তের সম্পর্কহীন অসংজ্ঞায়িত এক সম্পর্ক। তবে আমি ফেসবুকের সেই আইডি এখনো ভুলি নি, এখনো খুঁজে ফিরি। একসময় কিছু পরপর রাজশাহী শহর নিয়ে আপডেট আসত। কিন্তু এখন লাল কাপড়ে মুখ বাঁধা সেই পোস্টদাতার আইডিতে সবুজ বাতি আর জ্বলে না। হয়তো আমার এই ভাইটিই ছিল নয়তো কোনো আগন্তুক। চব্বিশের আগন্তুক! যার আলো নিভে গেছে আমার ভাইটির সাথেই।
Comments (0)
Login to leave a comment.