এ প্রথম বৈশাখ আমার জীবনে
এ প্রথম বৈশাখ আমার জীবনে
নেটের ঝড় তখনো আছড়ে পড়ে নি জীবনে। এজন্যই বোধহয় তপ্ত গরমেও গায়ে নোনা জল নিয়ে স্কুলের সামনে দাঁড়ানো ঠান্ডার দিকে চেয়ে থাকতাম। কখনো বা পাঁচটাকার হরলিক্স আইস্ক্রিমের দিকে। এখনকার ইগলু,পোলারের যুগেও সেই আইস্ক্রিম সোনার চেয়েও দামি। এমনি এক সকালে, খুব সম্ভবত ২০০৬ সালের ১৪ এপ্রিল। স্কুলে গরমের ছুটি, প্রথম বার্ষিক পরীক্ষার পর।
খুব সকালে ঘুম থেকে উঠলাম।তখনকার দ্বিতীয় শ্রেণির বইয়ে পহেলা বৈশাখের একটা বাংলা অধ্যায় ছিল। সেটা আমার ছিল মুখস্ত। বাবাকে ঝেড়ে শুনাই দিলাম। এরই বাহানায় বাবা নিয়ে গেল পদ্মা পাড়ে। সকাল সকাল, ঠান্ডা বাতাস,সূর্য তখনো পুরো দমে তার তাপ ছাড়ে নি। আহা! কি সুন্দর জীবন! দু-চারজন লোক এসেছে আমাদের মতই হাঁটতে। বসলাম নদীর পাড়ে, ঝিরঝির বাতাসে স্বল্প ছন্দে নদী বয়ে চলেছে। ইশ! নদীতে পা ভেজানোর অনুভূতি ছিল একদম কক্সবাজার লেভেলের। সেই আনন্দ! তবে বেশিক্ষণ স্থায়ী হল না সেই আনন্দ! কারণ বাবার কপালে ঘাম বিন্দু বিন্দু আকারে ঝরে পড়ছে। আর হঠাৎই আমি নিজেকে সেদ্ধ হওয়ার অনুভূতি পেলাম। আশ্রয় নিলাম বিরাট গাছটির ছায়ায়।
সকালে খাবো না বলেও একটা লুচি আর আলুর ভাজি পেটে পুরে দিলাম। কারণ আজকে খাব পান্তা আর ইলিশ ভাজা। মায়ের ডায়রিয়া হওয়ার শত চোখ রাঙানি উপেক্ষা করে বীরদর্পে চলেছিলাম পান্তা-ইলিশ খেতে। দুপুরে মেডিকেলের অডিটোরিয়ামে এক বিশাল প্যান্ডেল টাঙিয়ে চলছে পান্তা-ইলিশ উৎসব। জীবনের প্রথম পান্তা-ইলিশ খাওয়া। কি রকম হয় সেটাও জানি না। নেট ছিল না যে একটু দেখে নিব। পান্তা এল, মাটির পাত্রে পানির মধ্যে ভাত। দেখেই খুব হতাশ! ভাবলাম নতুন পদ্ধতিতে ভাত দিয়েছে বোধহয়। মা এই রান্নাটা জানে না হয়তো। অনেকক্ষণ ধরে এদিক-ওদিক তাকাচ্ছি পানিটুকু ফেলার জন্য। বাবা ঠিকই বুঝতে পেরেছিল। তাই সময় মত দেখিয়ে দিল খাওয়ার নিয়ম। তারপর আরও হতাশ! দিয়ে গেল ইলিশ ভাজা, যা খালি কাঁটায় ভরা, আমার চিরশত্রু। অতঃপর আলু,পেঁয়াজ ভর্তা। আমি পানির একপাশে রাখলাম ভর্তা, দিয়ে মাছের কাঁটা বাছায় মনোযোগ দিয়েছি। বাবাজি ভর্তা পানির মধ্যে গেল মিশে।অনেক খোঁজ করেও আর হদিস পাই নাই তার। কোনমতে পানি ভাত একটু খেয়ে আধ পেটা হয়ে বাসায় এসেছিলাম। কিন্তু টু শব্দটি করি নি,পাছে মা বকে!
বিকেলে গেছিলাম আসল মজার জায়গা, মেলাতে। উফ মন ভালো করার মত জায়গা, নাগরদোলা, পুতুল, মুড়ি-মুড়কি-খৈ-পেঁয়াজু-অমৃত জিলাপি!আহা!মন ভরে খেলাম পেঁয়াজু-জিলাপি। মা-বোনেরা আবার ফুচকার স্টলগুলো জমিয়ে রেখেছে,“আরেকটু টক,আরেকটু ঝাল দিন”। যাই হোক ডায়রিয়া হওয়া বারণ! তাই বেশি দেরি না করে সোজা বাসায়। ফিরতি পথেই পড়লাম বৈশাখী ঝড়ের কবলে।ধুলা উড়িয়ে, টিনের চাল উড়িয়ে থেমে গেল কিছুসময় পর।
তবে গল্পটা এখানে শেষ হলেও পারত। কিন্তু না! আষাঢের মেঘ গুরগুর করে শ্রাবণের ধারা যেভাবে পড়ে, ঠিক সেভাবে রাতের বেলা শুরু হল ডায়রিয়া। মায়ের একই কথা, “ঔষধ আমি দিব না!তুমি আমার কথা শুন না!” তারপরের ইতিহাস আর নাই বা বলি!ছোট ছিলাম বলে মায়ের হাত-পা ধরে, আর কোনদিন যাব না বলে সেবারের মত ছাড়া পেয়েছিলাম। এখনও মনে পড়লে হাসি। মোবাইল-ক্যামেরা কিছু ছিল না, সেলফি-ছবি-ভিডিও করে রাখার কোন তাড়নাও ছিল না। শুধু ছিল মুহূর্তগুলো অনুভব করা। ঠিক তাই করেছি।তাইতো আজও অবচেতন মনে সেই তাজা স্মৃতিকে মনে হয়,“এতো গতকালকের কথা!মাঝে এত সময় পেরোল কবে?” সেই ছোট্ট আমিই আজ এক বাচ্চার বাবা, আর আমার বাবা আজ তার দাদা!
Comments (0)
Login to leave a comment.