হয়তো এই জন্যই বেঁচে আছি

উঠানের এক কোণে দাঁড়িয়ে আছেন রাবেয়া বেগম।শূণ্য চাহনি নিয়ে দেখছেন প্রাচীরঘীরে থাকা শিউলি ফুলের গাছটা।গাছের পাতা গুলোয় জমে আছে বিন্দু বিন্দু শিশির। দেখছেন এক একটা শিউলি ফুল কিভাবে বাতাসের ধাক্কায় ঝরে পরছে!
রাবেয়া বেগমের পাশেই বেতের চেয়ারে বসে আছেন তার শাশুড়ী জোনাকি বিবি।ছল ছল চোখে হাতে তসবিহ গুনছেন।
নিরবতা ভেঙে জোনাকি বিবি বলে উঠন-"রহিম বেটা কহন আইবো পোলাডারে নিয়ে?"
-"তাদের তো গতকাল সন্ধ্যার মধ্যেই চলে আসার কথা"
-"ফেরি তে আইলে এতোহ দেরি হউওনের কথা নয়"
রাবেয়া বেগম তার শাশুড়ীর কাছে এসে বিচলিত কণ্ঠে বলেন -"মা আমার খুব অস্থির লাগছে!কত দিন বাবুটারে দেখি না,এতো দিন পরে বাবুটা ফিরছে তাও এই অবস্থায়! "
তার শাশুড়ী কিছুটা তাচ্ছিল্যের স্বরে বলেন-"নিজের পোলারে ইকটু বাইধা রাখন যায়না?কেমন মা তুমি যে নিজের পোলাডারে জেনেশোনে পাঠায় দিলে মরতে! তাও আল্লাহর দরবারে লাহো কোঠি শুকরিহা জানে বাঁইচা আইনছে নয়লে তুই চাহেতিস পোলাডার মরা মুখ দেহিতে।বাচ্চাডার এখন থেইকা বোঝা হইয়া থাকন লাগবো"
-"মা আমার বাচ্চাটা দেশে জন্য গেছে।এইটা তার দ্বায়িত্ব, আমার ছেলে আমার জন্য কোনো দিনও বোঝা না, সে আমার গর্ব,আমার অহংকার।"
রাবেয়া বেগম স্থির চোখে চেয়ে রইলেন বাড়ির মূল ফটকের দিকে।
কিছুক্ষণ পরেই ক্যাচক্যাচ আওয়াজ করে টিনের দরজা খুল
লেন রহিম মিয়া।জোনাকি বিবি দেখা মাত্রই কান্নায় ভেঙ্গে পরলেন। রাবেয়া বেগম ধীরে ধীরে এগিয়ে গেলেন হুইল চেয়ারে বসে থাকা ছেলে স্নিগ্ধর দিকে।পরম মমতায় জড়িয়ে ধরলেন ছেলেকে।দীর্ঘ সাত মাস পর ছেলেকে কাছে পেলেন। ছেলের পাশেই মাথা নিচু করে মলিন মুখে দাঁড়িয়ে আছেন বাবা রহিম মিয়া;আস্তে করে বললেন "চল ঘরে চল"
যখন স্নিগ্ধর জন্ম হয় সে ছিল দুধে আলতা বর্ণের। সেই দুধে আলতা বর্ণের ছোট্ট ফুলফুটে ছেলেটার বড় বড় কাজলকালো চোখের মায়ায় পরেই বাবা মা নাম রাখেন স্নিগ্ধ।
সেই স্নিগ্ধর মায়াবী চোখ 2টির একটি সে হারিয়েছে।ডানপাশের গালে একটা লম্বা ক্ষত যা সেলাই দেওয়া হয়েছে।সারা শরীর জুড়েই তার আঘাতের চিহ্ন। নিজের পায়ে একটা পাও সে হারিয়েছে।
রাতের বেলা বিছানায় মায়ের কোলে মাথা দিয়ে শুয়ে আছে স্নিগ্ধ।মা অতি যত্নে মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন।পাশেই বসে আছে হাত পাখা হাতে দাদী জোনাকি আর সুপারি কাটছেন বাবা রহমান। সকলের মুখই মলীন।
মা রাবেয়া বেগম বলে "কি হয়েছিল বাবা?"
জোনাকি বিবি বিরক্তির স্বরে বলেন "পোলাডারে এহন ওই সব কথা মনে করনের কি দরকার আহে?তোর কি ছে
লেটার জন্নি মায়াও হ্বন না নাহি?"
"-আমার ছেলে এক বীর!সে সেইসব দিন গুলোর কথা ভেবে কেন ভয় পাবে?সে গর্ব করে বললে তার সাহসীকতার কথা!আর আমি মা হয়ে শুনবো আমার ছেলেএ বীরত্বগাঁথা"
রহিম মিয়া বলেন - "হ্যাঁ আমি যেইটা পারিনি আমার ছেলে সেইটা করে দেখিয়েছে। তারে মায়া কেন করবো? তারে নিয়া তো আমরা গর্ব করবো,সম্মান করবো! বাবা তুই বল "
"মা আমরা আমাদের দল নিয়ে গেছিলাম পাকিস্তানি বাহিনীর এক গোপন আস্তানায়, খবর পাই যে এক বাড়িতে নানা ধরনের অস্ত্র মজুদ রেখে গোপনে হামরার পরিকল্পনা চলছে হানাদার বাহিনীর। সেখানে আমাদের কিছু গেরিলা যোদ্ধাদেরও আটক করে রাখা হয়।
এক রাতে আমরা সেখানে অভিযান চালাই।প্রথমে ট্রান্সমিটার বিষ্ফোরণ ঘটাই ফলে গোটা এলাকায় বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়।
তারপর সকলেই সেই দিকে ব্যস্ত হয়ে পরলে আমরা তাদের চোখ ফাকি দিয়ে আমাদের গেরিলা যোদ্ধাদের উদ্ধার করি কিন্তু ফিরার পথে তাদের সাথে আমাদের হাতাহাতি শুরু হয়। সু্যোগ বুঝে বাকিরা পালাতে পারলেও আমিসহ আরও 2জন সহ যোদ্ধা বন্ধী হই তাদের হাতে । তারা আমাদের আটক রাখে ২৫ দিন।প্রতিদিনই আমাদের উপর পৈশাচিক নির্যাতন করেছে
তারা।লাঠি দিয়ে মেরে কালশিরা পড়ায় দিছিল গায়ে গরম পানি দিয়ে দিত, এক গাছের সাথে উলটো করে বেধে রেখে গাছের সাথে বার বার বারি মারতো যার ফলে গাছের ছালের সাথে আমাদের মাংসএর টুকরো আর রক্ত লেগে থাকতো। জানো মা বাবা তোমাদের কথা খুব মনে পরতো তখন দাদীর কথা মনে হলে কান্না আসতো!এমন কোনো দিন নাই আল্লাহর কাছে তোমাদের জন্য দোয়া করি নাই!এই পাশানদের থেকে আল্লাহ যেনো তোমাদের রক্ষা করে রাখে তাই চাইতাম।তাদের মূল উদ্দেশ্য ছিল আমাদের থেকে আমাদের গোপন
তথ্য বের করা কিন্তু আমাদের থেকে কোনো সুবিধা না পাওয়ায় আমাদের উপর নির্যাতনের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়।আমার এক সহযোদ্ধাকে হত্যা করে তারা।আমার পা ভেঙে ফেলে চোখে কাচ দিয়ে আঘাত করে।আমাদের নির্যাতন করাই ছিল তাদের বিনদনের মাধ্যম।অবশেষে আমাদের গেরিলা বাহিনী আমা
দের উদ্ধার করে ৮ ডিসেম্বর। আমাদের ক্যাম্পে নিয়ে চিকিৎসা শুরু করে।চিকিৎসা চলা কালীন আমার আর এক সহযোদ্ধা মারা যান,আর আমার অবস্থাও ছিল আশঙ্কাজনক!মা জানো এতো কষ্ট হতো তখন!আমি না নরতে পারতাম না আমার মনে হত প্রতিটা দিন এখনও আমার উপর নির্যাতন চালানো হচ্ছে!ব্যাথ্যা জ্বালা যন্ত্রণা আর সহ্য হতো না মনে হতো এর থেকে মরে যাওয়াই ভালো
যখন বেঁচে থাকার সব আশা ছেড়ে দেই তখন শুনি ১৬ই ডিসেম্বর আমরা বিজয় পেয়েছি।আমরা স্বাধীনতা পেয়েছি মুক্তি পেয়েছি,আমরা যুদ্ধে বিজয়ী হয়েছি!
যেই আমি ব্যাথ্যার জন্য বাঁচিতে চাইতাম না সেই আমিই খুব করে বাঁচতে চাই মা, এই স্বাধীন দেশকে দেখতে চাই খুব করে দেখতে চাই!এই জন্যই হয়তো বেঁচে আছি কারণ এই আমার এই দেশকে এনে দেওয়া স্বাধীনতাকে আমি উপভোগ করতে চাই!
কথা গুলো শুনতে শুনতে সবার চোখে
পানি ছল ছল করছে। দাদী জোনাকি বিবি তার নাতি স্নিগ্ধকে কানতে কানতে জড়িয়ে ধরলেন! রহিম মিয়া বললেন
"আমি এমন এক সন্তানের পিতা যে নিজের দেশের স্বাধীনতা এনে দিয়েছে! দিনটা দেখার জন্যই হয়তো আমি এত দিন বেঁচে আছি"
Comments (0)
Login to leave a comment.