৩৬ই ছাত্র বীর
২০২৪ সালের জুলাইয়ের প্রথমার্ধ। রোদের উত্তাপ ছাপিয়ে বাতাসে ছড়িয়ে পড়েছিল তারুণ্যের তীব্র উদ্দীপনা। রাজপথ তখন দাবির আওয়াজে মুখরিত, শত শত চোখ ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্নে উজ্জ্বল। কিন্তু কে জানত, সেই শ্রাবণের বরষায় শুধু বৃষ্টি নয়, রাজপথে ঝরবে একঝাঁক তাজা প্রাণ, রচিত হবে শোক আর বীরত্বের মহাকাব্য।
রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস। দুপুর নেমেছে প্রখর তেজ নিয়ে। পুলিশ ও আন্দোলনকারীদের মুখোমুখি অবস্থান। ঠিক তখনই মিছিলে দেখা গেল একটি অবিকল ও নিভীক মুখ—আবু সাঈদ। ইংরেজি সাহিত্যের শিক্ষার্থী, কিন্তু সেদিনের রোদ তাকে শিক্ষক বানাল সাহসের। কোনো অস্ত্র নেই, কোনো ঘৃণা নেই—দু হাত প্রসারিত করে সে বুকের চাদর মেলে দিল অন্যায়ের বুলেটগুলোর সামনে। যখন বুলেটের আঘাতে সে রাজপথে লুটিয়ে পড়ছিল, ঠিক সেই মুহূর্তে সাঈদ শুধু একা পড়েনি; ইতিহাস লিখে গেল এক অমর কবিতা। সাঈদের পরিবার তার এই ত্যাগে হারিয়েছে তাদের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎকে, কিন্তু সেই বাবা-মা অশ্রুসজল চোখে আজও গর্ব করে বলেন, "আমার সাঈদ দেশের জন্য বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়েছে, ও মরেনি, ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রদীপ হয়ে জ্বলছে।" সাঈদের মায়ের সহনশীলতা আর পিতার গর্বিত চোখের জল সমস্ত প্রথাগত সম্মানের ঊর্ধ্বে এক পবিত্র স্মারক।
শুধু সাঈদ নন, সেই উত্তাল জুলাই কেড়ে নিয়েছে আমাদের সেরা ফুলগুলোকে।
ঢাকার উত্তরার রাজপথে যখন বুলেটের শব্দ, তখন সহপাঠীদের রক্ষা করতে বুক আগলে দাঁড়িয়েছিলেন ফারহান ফাইয়াজ। সবেমাত্র কলেজের চৌকাঠে পা দেওয়া এক তরুণ, যার চোখে ছিল অনেক দূর যাওয়ার স্বপ্ন। ফাইয়াজের মা যখন সন্তানের জামাটা বুকের সাথে জড়িয়ে ধরে কান্না চেপে রাখেন, সেই নিরবতার মধ্যেও লুকিয়ে থাকে এক বিশাল সম্মান। সন্তান হারানোর ব্যথাকে ছাপিয়ে সেই পরিবার আমাদের শিখিয়েছে, কী করে বীরের স্মৃতিকে ধারণ করে মাথা উঁচু করে বাঁচতে হয়।
কিংবা বুয়েটের মেধাবী ছাত্র ফারদিন ইসলাম বা সাভারের তরুণ শিক্ষার্থী সজীবের কথা—যারা প্রত্যেকেই নিজ নিজ পরিবারের এক টুকরো আলো ছিলেন। অনেক অভিভাবক সারা জীবনের জমানো সঞ্চয় দিয়ে সন্তানকে বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠিয়েছিলেন একমুঠো স্বপ্নের আশায়। তারা ভেবেছিলেন, পড়াশোনা শেষ করে ছেলে বা মেয়ে পরিবারের হাল ধরবে, মুখে হাসি ফোটাবে। কিন্তু জুলাইয়ের রক্তাক্ত দিনগুলো তাদের ঘরে ফিরিয়ে দিল নিথর দেহ।
সেই পিতামাতাদের ত্যাগের কোনো তুল্যমূল্য হয় না। প্রতিটি শহীদের মা-বাবা যেদিন সন্তানের রক্তভেজা শার্ট বুকে জড়িয়ে ধরেছেন, সেদিন গোটা দেশ নতশিরে দাঁড়িয়েছে তাদের প্রতি শ্রদ্ধায়। তারা শুধু সন্তান হারাননি, তারা দেশকে দিয়েছেন নতুন এক সূর্যোদয়ের ঠিকানা। যে সন্তানরা পরোপকার, দায়িত্ববোধ আর সহপাঠীদের ভালোবেসে নিজেদের বিলিয়ে দিল, সেই সন্তান গড়ে ওঠার নেপথ্যে ছিল এই মা-বাবাদেরই দেওয়া সততা ও সাহসের শিক্ষা।
জুলাই
আগস্ট
Comments (0)
Login to leave a comment.