"লাল-সাদা সকাল"......
ভোরের আলোটা যেন আজ একটু আলাদা। গ্রামের আকাশে সূর্য উঠতেই চারদিক লাল-সাদা রঙে রঙিন হয়ে উঠল। রাহাত ঘুম থেকে উঠেই বুঝতে পারল—আজ পহেলা বৈশাখ। তার ছোট্ট গ্রাম রূপসীপুরে এই দিনটা যেন এক নতুন জীবনের শুরু।
মা ইতিমধ্যেই রান্নাঘরে পান্তা-ইলিশ সাজিয়ে রেখেছেন। উঠোনে আলপনা আঁকা, পাশে রঙিন কাগজের ফুল ঝুলছে। দূর থেকে ভেসে আসছে ঢোলের শব্দ, আর মাইক থেকে বাজছে পুরনো বাংলা গান। রাহাত দৌড়ে বাইরে গেল, দেখল তার বন্ধুরা সবাই নতুন পাঞ্জাবি আর ফ্রক পরে প্রস্তুত।
গ্রামের মাঠে আজ বৈশাখী মেলা বসেছে। বাঁশের তৈরি দোকান, হাতে বানানো খেলনা, মাটির পাত্র, আর নানা রকম পিঠা—সব মিলিয়ে যেন এক অন্য জগৎ। রাহাত তার বন্ধু সোহেল আর মিতুর সঙ্গে মেলায় ঢুকতেই চোখ ঝলসে গেল রঙের ছটায়।
ওদিকে গ্রামের প্রবীণ লোকেরা বৈশাখের ইতিহাস আর তাৎপর্য নিয়ে আলোচনা করছেন। শিশুদের জন্য আয়োজন করা হয়েছে লাঠিখেলা, নাচ আর গান। রাহাতও সাহস করে মঞ্চে উঠে একটি কবিতা আবৃত্তি করল। সবাই হাততালি দিল, আর তার বুকটা গর্বে ভরে উঠল।
হঠাৎই মেলায় শহর থেকে আসা একদল মানুষের দেখা মিলল। তারা ক্যামেরা হাতে গ্রামবাংলার বৈশাখ উদযাপন ধারণ করছে। তাদের একজন রাহাতকে জিজ্ঞেস করল, “তোমরা প্রতি বছর এমনভাবে উদযাপন করো?” রাহাত হেসে বলল, “এটা শুধু উৎসব না, এটা আমাদের হৃদয়ের অংশ।”
শহরের মানুষগুলো অবাক হয়ে চারদিকে তাকাচ্ছিল। তাদের চোখে যেন এক ধরনের বিস্ময়—এত সরল অথচ এত প্রাণবন্ত আনন্দ! তারা বুঝতে পারছিল, শহরের ঝাঁ-চকচকে আয়োজনের মাঝেও এমন আন্তরিকতা অনেক সময় হারিয়ে যায়।
বিকেলের দিকে শুরু হলো মঙ্গল শোভাযাত্রা। গ্রামবাসী সবাই মিলে মুখোশ, ব্যানার আর রঙিন সাজে মিছিল বের করল। রাহাত একটি বাঘের মুখোশ পরে সামনে হাঁটছিল। তার মনে হচ্ছিল, সে যেন এই গ্রামেরই এক গর্বিত প্রতিনিধি।
সূর্য যখন ডুবে গেল, তখনও আনন্দ থামেনি। সবাই মিলে গান গাইল, নাচল, আর নতুন বছরের স্বপ্ন দেখল। রাহাত আকাশের দিকে তাকিয়ে ভাবল—এই দিনটাই তাকে শিখিয়েছে, সুখ মানে বড় কিছু না, একসাথে থাকার আনন্দই আসল।
রাতের শেষে মা যখন তাকে ডাকলেন, রাহাতের চোখে তখনও দিনের রঙ লেগে আছে। সে জানে, এই বৈশাখ তার জীবনের সেরা স্মৃতিগুলোর একটি হয়ে থাকবে।
Comments (0)
Login to leave a comment.