"অমলিন প্রতিশ্রুতি"......

১৯৭১ সালের উত্তাল সময়। চারদিকে অস্থিরতা, ভয় আর প্রতিরোধের আগুন। ময়মনসিংহের এক শান্ত গ্রামে বাস করতেন আব্দুস সালাম। সাধারণ একজন স্কুলশিক্ষক, কিন্তু মনটা ছিল অসাধারণ সাহসিকতায় ভরা।
তার পরিবার ছিল ছোট—স্ত্রী রহিমা, ছেলে সামির (৬ বছর) আর মেয়ে তানিয়া (৩ বছর)। দিনগুলো শান্তভাবেই কাটছিল, কিন্তু মার্চের সেই কালো দিনগুলো সবকিছু বদলে দেয়।
২৫ মার্চের পর থেকেই চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে ভয়ের ছায়া। গ্রামের মানুষজন আতঙ্কে দিন কাটাতে থাকে। এক রাতে সালাম গ্রামের কিছু যুবককে নিয়ে গোপনে বৈঠক করেন।
“আমরা যদি চুপ করে থাকি, তাহলে এই অন্যায় কখনো শেষ হবে না,” তিনি দৃঢ় কণ্ঠে বললেন।
রহিমা বুঝতে পারছিল, তার স্বামী একটা বড় সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছেন। সেই রাতে তিনি সালামের হাত ধরে বলেছিলেন,
“তুমি গেলে আমাদের কী হবে?”
সালাম হেসে বলেছিলেন,
“আমি না গেলে আমাদের ভবিষ্যৎই থাকবে না।”
কয়েকদিন পরেই তিনি বাড়ি ছেড়ে চলে যান। রেখে যান শুধু কিছু স্মৃতি আর এক বুক অজানা অপেক্ষা।
দিন যেতে থাকে। রহিমা সংসারের সব দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেয়। ছোট্ট সামির প্রতিদিন মাকে জিজ্ঞেস করত,
“আব্বু কবে আসবে?”
রহিমা শুধু বলত,
“তোমার আব্বু দেশের জন্য কাজ করছে।”
এই কথাটা সামিরের মনে গভীরভাবে গেঁথে যায়।
ডিসেম্বর মাস আসে। চারদিকে বিজয়ের আনন্দ, কিন্তু রহিমার ঘরে নেমে আসে নীরবতা। একদিন খবর আসে—সালাম আর ফিরবেন না। তিনি শহীদ হয়েছেন।
রহিমা কিছুক্ষণ নিশ্চুপ থাকে। তারপর ছেলেমেয়েকে বুকে জড়িয়ে ধরে বলে,
“তোমাদের আব্বু হেরে যায়নি, সে জিতেছে—দেশকে জিতিয়েছে।”
সেই দিন থেকেই সামির বদলে যায়।
সে আর আগের মতো জেদ করে না, কান্নাকাটি করে না। বরং চুপচাপ বসে বাবার গল্প শোনে। তার মনে একটা অদ্ভুত দায়িত্ববোধ জন্ম নেয়।
বছর কেটে যায়। সামির বড় হয়। স্কুলে সে সবসময় সবার আগে থাকে। শিক্ষকরা তাকে ভালোবাসে।
একদিন স্বাধীনতা দিবসে তাকে বক্তৃতা দিতে বলা হয়। মঞ্চে উঠে সে বলেছিল,
“আমার আব্বু একজন মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। তিনি শুধু আমার বাবা নন, তিনি আমার গর্ব।”
এই কথায় পুরো মাঠ স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল।
তানিয়াও বড় হতে থাকে। সে মায়ের মতোই ধৈর্যশীল আর শক্ত মনের মানুষ হয়ে ওঠে।
সময়ের সাথে সাথে সামির বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়। সে ইতিহাস নিয়ে পড়াশোনা শুরু করে। কারণ সে জানতে চায়—তার বাবার মতো মানুষদের গল্প কেন সবাই জানে না।
একদিন গবেষণার কাজে সে একটি পুরনো মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে যায়। সেখানে এক বৃদ্ধ মুক্তিযোদ্ধার সাথে তার দেখা হয়।
বৃদ্ধটি তার বাবার নাম শুনেই চমকে ওঠেন।
“তুমি সালাম ভাইয়ের ছেলে?”
সামির অবাক হয়ে বলে,
“আপনি আমার আব্বুকে চিনতেন?”
বৃদ্ধটি চোখ মুছতে মুছতে বলেন,
“চিনতাম? তিনি ছিলেন আমাদের সবার সাহস। একবার তিনি নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পুরো একটি গ্রামকে রক্ষা করেছিলেন।”
এই কথা শুনে সামিরের বুক ভরে ওঠে। সে বুঝতে পারে—তার বাবার গল্প শুধু তার পরিবারের নয়, অনেক মানুষের জীবনের সাথে জড়িয়ে আছে।
সে সিদ্ধান্ত নেয়—এই গল্পগুলো সে লিখে রাখবে।
এদিকে তানিয়া শিক্ষকতা পেশা বেছে নেয়। সে গ্রামে থেকেই শিশুদের পড়াতে শুরু করে।
একদিন এক ছাত্র তাকে জিজ্ঞেস করে,
“ম্যাডাম, মুক্তিযুদ্ধ কেন হয়েছিল?”
তানিয়া হাসিমুখে উত্তর দেয়,
“যেন তুমি স্বাধীনভাবে প্রশ্ন করতে পারো।”
তার এই উত্তরটি ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে।
বছরের পর বছর ধরে সামির তার বাবার গল্প সংগ্রহ করে, লিখে, প্রকাশ করে। একসময় তার লেখা বই মানুষ পড়তে শুরু করে।
মানুষ জানতে পারে—সালাম শুধু একজন যোদ্ধা ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন স্বপ্নদ্রষ্টা।
একদিন বই প্রকাশনার অনুষ্ঠানে সামির বলেছিল,
“আমি আমার বাবাকে কখনো বড় হয়ে দেখতে পাইনি। কিন্তু তার স্বপ্ন আমাকে বড় করেছে।”
সেই অনুষ্ঠানে উপস্থিত অনেকেই চোখের জল ধরে রাখতে পারেনি।
রহিমা তখন বৃদ্ধা। তিনি মঞ্চের এক কোণে বসে ছেলের কথা শুনছিলেন। তার চোখে তখন গর্ব আর শান্তির মিশ্রণ।
তিনি মনে মনে বলছিলেন,
“তুমি তোমার প্রতিশ্রুতি রেখেছো, সালাম।”
একদিন সন্ধ্যায় রহিমা তার দুই সন্তানকে পাশে বসিয়ে বলেন,
“মনে রেখো, মুক্তিযুদ্ধ শুধু অতীত নয়, এটি আমাদের প্রতিদিনের দায়িত্ব।”
তার কথাগুলো সামির আর তানিয়ার মনে গভীরভাবে গেঁথে যায়।
রহিমা চলে যাওয়ার পরও তারা সেই দায়িত্ব পালন করে যায়।
আজ সামির একজন খ্যাতনামা লেখক, আর তানিয়া একজন আদর্শ শিক্ষক।
তারা দুজনেই নিজেদের কাজের মাধ্যমে মানুষের মাঝে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ছড়িয়ে দিচ্ছে।
তাদের জীবনের প্রতিটি সিদ্ধান্তে, প্রতিটি কাজে লুকিয়ে আছে একজন মুক্তিযোদ্ধার শিক্ষা।
এই গল্প একটি পরিবারের, কিন্তু এর প্রতিধ্বনি শোনা যায় পুরো দেশের প্রতিটি কোণে।
কারণ মুক্তিযুদ্ধ শুধু ইতিহাস নয়—এটি একটি অমলিন প্রতিশ্রুতি, যা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বয়ে চলে।
Comments (0)
Login to leave a comment.