অপেক্ষার ৩৬ জুলাই
ক্যালেন্ডারের পাতায় ৫ই আগস্ট লেখা থাকলেও রফিকের কাছে দিনটা ছিল ৩৬শে জুলাই। গত একটা মাস ধরে রফিকের জীবনের দিন-তারিখের হিসাব ওলটপালট হয়ে গেছে। জুলাইয়ের প্রতিটি দিন যেন একেকটি শতাব্দীর সমান দীর্ঘ ছিল। রক্ত, বুলেট, আর কান্নার নদী পেরিয়ে আজ অবশেষে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ এসেছে, যার জন্য লাখো প্রাণ চাতক পাখির মতো অপেক্ষা করছিল।রফিকের মনে পড়ছিল তার ছোট ভাই রাসেলের কথা। একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী রাসেল। আন্দোলনের শুরু থেকেই সে ছিল প্রথম সারিতে। রফিক প্রতিদিন সকালে রাসেলকে বলত, "সাবধানে থাকিস ছোট, পরিস্থিতি ভালো না।" রাসেল মৃদু হেসে বলত, "ভাইয়া, ভয় পেলে তো অধিকার আদায় হবে না। রক্ত যখন দিতে শিখেছি, তখন বিজয় না নিয়ে ঘরে ফিরব না।"আজ সেই বিজয়ের দিনে রাসেল পাশে নেই। গত ১লা আগস্ট একটা বুলেটের আঘাতে রাসেলের সেই সাহসী কণ্ঠ চিরতরে স্তব্ধ হয়ে গেছে। রাসেল আজ কবরে ঘুমিয়ে আছে, কিন্তু তার স্বপ্ন আজ বাস্তবে রূপ নিয়েছে।দুপুর গড়াতেই চারদিক থেকে মানুষের ঢল নামতে শুরু করল। "বিজয়! বিজয়!" ধ্বনিতে আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত হয়ে উঠল। রফিক একা ঘরে বসে থাকতে পারল না। রাসেলের একটা ছবি বুকে জড়িয়ে সে রাজপথে নেমে এলো। রাজপথের দৃশ্য দেখে রফিকের চোখ ভিজে উঠল।সে দেখল, একজন রিকশাচালক তার রিকশায় বাংলাদেশের লাল-সবুজ পতাকা বেঁধে বিনা ভাড়ায় মানুষকে বিজয়ের মিছিলে পৌঁছে দিচ্ছেন। এক বৃদ্ধা মা রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে মিছিলে যাওয়া ক্লান্ত তরুণদের মাঝে পানি আর চকলেট বিলিয়ে দিচ্ছেন। রফিক বুঝতে পারল, এই বিজয় শুধু কোনো বিশেষ গোষ্ঠীর নয়; এই বিজয় রিকশাচালক, চা-দোকানি, ছাত্র, শিক্ষক আর সাধারণ মানুষের সম্মিলিত সাহসের ফসল।মিছিলের একটি জায়গায় এসে রফিকের চোখ আটকে গেল। একদল তরুণ দেওয়ালে দেওয়ালে রং-তুলি দিয়ে নতুন বাংলাদেশের ছবি আঁকছে। বুলেট যেখানে দেওয়াল ঝাঁঝরা করে দিয়েছিল, সেখানে আজ ফুটে উঠছে প্রতিবাদের কবিতা আর বিজয়ের স্লোগান। রফিক রাসেলের ছবির দিকে তাকাল। তার মনে হলো, রাসেল মারা যায়নি। এই লাখো তরুণের চোখের আলোয়, তাদের স্লোগানে রাসেল বেঁচে আছে।বিকেলের সূর্য যখন অস্ত যাচ্ছিল, তখনো রাজপথে মানুষের উল্লাস থামেনি। রফিক আকাশের দিকে তাকিয়ে বুক ভরে দীর্ঘশ্বাস নিল। আজ থেকে আর কোনো মায়ের কোল খালি হবে না, আর কোনো ভাইকে তার ভাইয়ের রক্ত মাখা জামা বুকে জড়িয়ে কাঁদতে হবে না। স্বৈরাচারের পতন ঘটিয়ে ছাত্র-জনতা আজ যে নতুন ভোরের সূচনা করেছে, তা চিরকাল অক্ষয় হয়ে থাকবে।রফিক আলতো করে রাসেলের ছবিতে হাত বুলালো এবং ফিসফিস করে বলল, "দেখ ছোট, তোদের রক্ত বৃথা যায়নি। আজ ৩৬শে জুলাই, আমরা জিতে গেছি।"
Comments (0)
Login to leave a comment.