BanglaTech

© 2026 Bangla Technologies. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত.

একটিNerddevs Ltd-এর প্রোডাক্ট
হোমঅনুসন্ধানআমাদের সম্পর্কেটিউটোরিয়ালশিক্ষকদের জন্যকোচিং সেন্টারের জন্যগোপনীয়তা নীতিসেবার শর্তাবলি

ওরও একটা মন আছে

M
Md Delwar Hossain
May 16, 2026 · 1202 views
ওরও একটা মন আছে
~5 মিনিট পড়তে
16px

ঘুম ভেঙে গেল।

হঠাৎ করে কেন যেন মায়ের কথা মনে পড়ছে। মনে হচ্ছে এখনই গ্রামের বাড়িতে চলে যাই — মায়ের সাথে দেখা করে আসি। মায়ের হাতের সেই গরম ভাত, একটু আলু ভর্তা, পাশে বসে মাথায় হাত বুলিয়ে দেওয়া — মনে হচ্ছে এই মুহূর্তে এর চেয়ে দামি কিছু পৃথিবীতে নেই।

হঠাৎ করে আমার ইউনিভার্সিটির কথা মনে পড়ে গেল।

আমি তখন হলে থাকি। রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়। হঠাৎ একদিন এরকম খুব খারাপ লাগছিল — মনে হচ্ছে এখনই আমাকে আমার মায়ের কাছে যেতে হবে। কী আর করা, সময় দেখলাম — রাজশাহী থেকে মধুমতি ট্রেন ছাড়বে ভোর ছ'টার দিকে — তখন বাজে পাঁচটা দশ। লাফ দিয়ে উঠে গেলাম। তাড়াতাড়ি একটা ব্যাগে কিছু একটা ভরে বের হয়ে গেলাম। অল্পের জন্য ট্রেন মিস করিনি। ঠিকই গ্রামের বাড়িতে গিয়ে মাকে সারপ্রাইজ দিয়ে দিলাম।

মা দরজা খুলে এক মুহূর্ত হতবাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। তারপর সেই চিরচেনা হাসি — চোখে পানি, কিন্তু ঠোঁটে হাসি। "তুই! এই সকালে! কিছু খেয়ে এসেছিস?" — মায়ের প্রথম কথা।

অনেক সুন্দর ছিল সেই ইউনিভার্সিটির সময়টা। যখন যা ইচ্ছা তা-ই করা যেত। মন চাইলে ব্যাগ গুছিয়ে বেরিয়ে পড়া, মন চাইলে সারারাত জেগে থাকা, মন চাইলে মাঝরাতে মায়ের কাছে ছুট দেওয়া। কোনো হিসাব নিকাশ ছিল না। কোনো বাঁধন ছিল না।

চিন্তা করতে করতে হঠাৎ আমার পাশে ঘুমিয়ে থাকা আমার গৃহিণীর দিকে চোখ পড়ল।

আর তখনই মনে হলো — ওহ, যাক, আমি যদি এখন বাড়িতে যাই — বাচ্চাদের স্কুল, কোচিং নিয়ে কোনো চিন্তা করতে হবে না। ও ঠিকই সব সামলে নেবে। সকালে বাচ্চাদের নাশতা বানিয়ে দেবে, স্কুলে পাঠাবে, দুপুরে কোচিং থেকে আনতে যাবে, বিকেলে পড়াতে বসাবে। আমি একটা ফোন করে দিলেই হবে — "আমি একটু গ্রামে যাচ্ছি, মাকে দেখতে।" ও বলবে, "ঠিক আছে, সাবধানে যেও।"

ব্যস। এতটাই সহজ।

যখনই উঠতে যাব — তখনই আবার ওর দিকে চোখ পড়ল।

ঘুমন্ত মুখটা। কী নিষ্পাপ! চুলগুলো এলোমেলো হয়ে কপালে এসে পড়েছে। ঠোঁটের কোণে অস্পষ্ট একটা হাসির রেখা — হয়তো কোনো সুন্দর স্বপ্ন দেখছে। কেমন যেন একটা মায়া মাখা মুখ। দেখে মনে হতে লাগল —

আচ্ছা, আমার যে ইচ্ছা এখন হচ্ছে — ওর কি এরকম ইচ্ছা হতে পারে?

ওরও তো মা আছে। বাবা আছে। ওরও তো একটা ভাই আছে, যে ছোটবেলায় ওকে কাঁধে নিয়ে মেলায় গিয়েছিল। ওরও তো একটা ছোট বোন আছে, যার সাথে ও বালিশ ভাগাভাগি করে ঘুমাত। ওরও তো একটা শৈশব আছে — যেখানে ও দৌড়ে বেড়াত, পুকুরে ঝাঁপ দিত, আমগাছে চড়ত।

বিয়ের পর আমি তো ভুলেই গেছি — ওর একটা নিজস্ব জগৎ ছিল। ওর একটা বাবা আছেন — যিনি হয়তো এখনো সকালে উঠে মেয়ের কথা ভাবেন। ওর একটা মা আছেন — যিনি হয়তো এখনো রান্নাঘরে কিছু রান্না করতে গিয়ে থেমে যান, ভাবেন — "মেয়েটা এটা খুব পছন্দ করত।"

ওর যদি এরকম ইচ্ছা হয় — হঠাৎ ভোর পাঁচটায় ঘুম ভেঙে যদি ওর মায়ের কথা মনে পড়ে — তাহলে ও কী করবে?

ও কি এভাবে ছুটে বাড়ি যেতে পারবে?

পারবে না। কারণ সকাল সাতটায় বাচ্চাকে স্কুলে পৌঁছে দিতে হবে। কারণ বড়টার গণিত পরীক্ষা — পড়া ধরিয়ে দিতে হবে। কারণ আমার অফিসের শার্ট ইস্ত্রি করা হয়নি। কারণ শাশুড়ির ওষুধ ফুরিয়ে এসেছে। কারণ — কারণ — কারণ।

ও জানে, ও চাইলেও যেতে পারবে না। তাই হয়তো ও চায়ও না। চাওয়াটা ভুলে গেছে। অথবা চাওয়াটা চাপা দিয়ে রেখেছে এই সংসারের ভারের নিচে।

কিন্তু চাওয়াটা কি সত্যিই মরে গেছে?

আমি ওর মুখের দিকে আরো ভালো করে তাকালাম। মনে পড়ল — গত মাসে যখন ওর মা ফোন করেছিলেন, ও রান্নাঘরের কোণে দাঁড়িয়ে কথা বলছিল। আমি পাশ দিয়ে যেতে যেতে দেখেছিলাম — ওর চোখটা ভেজা। আমি কিছু জিজ্ঞেস করিনি। ভেবেছিলাম, মায়েদের সাথে মেয়েদের কথা — এটা স্বাভাবিক।

আসলে কি স্বাভাবিক?

ও কত বছর হলো বাবার বাড়িতে যায়নি ঠিকঠাক? গত ঈদে গিয়েছিল — তিন দিন থেকে চলে এসেছিল। কারণ আমার অফিস ছিল, বাচ্চাদের কোচিং ছিল। ও বলেছিল, "থাক, পরে আবার যাব।" সেই "পরে" আর কখনো আসেনি।

বিয়ের আগে ও কেমন ছিল? আমি জানি না।

কেমন আশ্চর্য কথা — যে মেয়েটার সাথে আমি গত দশ বছর ধরে একই বিছানায় ঘুমাচ্ছি, তার শৈশব সম্পর্কে আমি প্রায় কিছুই জানি না। ও কোন স্কুলে পড়ত? ওর প্রিয় শিক্ষকের নাম কী ছিল? কোন বইটা পড়ে ও প্রথম কেঁদেছিল? ছোটবেলায় ওর সবচেয়ে কাছের বন্ধু কে ছিল? এখন সে কোথায়?

আমি জানি না। কারণ আমি কোনোদিন জিজ্ঞেস করিনি।

আমি ওকে চিনি একজন স্ত্রী হিসেবে। একজন মা হিসেবে। একজন রাঁধুনি, একজন গৃহিণী, একজন দায়িত্ববান মানুষ হিসেবে। কিন্তু ওর ভেতরে যে সেই মেয়েটি এখনো বেঁচে আছে — যে ভোর পাঁচটায় উঠে মায়ের কাছে ছুটে যেতে চায় — সেই মেয়েটিকে আমি চিনি না।

মধুমতি ট্রেন এখনো ছাড়ে। প্রতিদিন ভোর ছ'টায়। কিন্তু আমার স্ত্রীর জন্য সেই ট্রেন নেই। ওর জন্য কোনো ট্রেন রাখা হয়নি।

আমি বিছানা থেকে উঠলাম না।

বরং আস্তে করে ওর কপালের চুলগুলো সরিয়ে দিলাম। ও একটু নড়ে উঠল ঘুমের মধ্যে। আমি ফিসফিস করে বললাম — "এই, ওঠো না।"

ও চোখ মেলল। একটু অবাক হয়ে তাকাল। "কী হয়েছে? কয়টা বাজে?"

"কিছু হয়নি। চলো, আজকে গ্রামে যাই। তোমার বাবার বাড়িতে। বাচ্চাদের স্কুল আজকে ছুটি দেব। আমি অফিসেও যাব না।"

ও কিছুক্ষণ আমার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। যেন বিশ্বাস করতে পারছে না।

তারপর ওর চোখ দু'টো ভিজে উঠল। শুধু এতটুকু বলল — "সত্যি?"

আমি মাথা নাড়লাম।

ও উঠে বসল। তাড়াতাড়ি ব্যাগ গোছাতে লাগল। ওর হাত কাঁপছিল। দশ বছরে এই প্রথম, ও নিজের ইচ্ছার কথা ভেবে কিছু করতে যাচ্ছে।

আমি দেখলাম, ও ব্যাগ গোছাতে গোছাতে মৃদু মৃদু হাসছে — ঠিক যেমন একদিন আমি ভোর পাঁচটায় মায়ের কাছে যাওয়ার সময় হেসেছিলাম।

ওরও একটা মন আছে।

আজ দশ বছর পর আমি সেটা বুঝলাম।

আরও দেখুন

🏆
কুইজ প্রতিযোগিতায় অংশ নিন
ফ্রি অনলাইন কুইজ, জিতুন পুরস্কার।
✏️
নিজে কুইজ তৈরি করুন
শিক্ষক ও টিউটরদের জন্য ফ্রি টুলস।
✨
BanglaTech সম্পর্কে
আমাদের গল্প ও মিশন।

Comments (0)

Login to leave a comment.