পর্ব–৩: নাচঘরের নিচে লুকানো রহস্য
পুরনো যন্ত্রঘর থেকে বের হওয়ার পরও তিনজনের শরীর কাঁপছিল। বাতাসে যেন অদ্ভুত একটা ঠান্ডা ভাব… যেন কেউ তাদের পথচলা দেখছে।
কেয়ারটেকার সামনে হাঁটছিলেন, হাঁটার সময় তার লাঠির ঠকঠক শব্দ লজের নীরবতার মধ্যে আরও ভৌতিক করে তুলছিল।
রিফাত চোখ মুছতে মুছতে বলল,
“দ্বিতীয় চিহ্ন… নাচঘরের নিচে… এটা কে লিখে? কে আমাদের খুঁজতে বলছে?”
তুহিন ফিসফিস করে বলল,
“হয়তো… কেউ আমাদের পরীক্ষা নিচ্ছে?”
নাবিল চুপচাপ ছিল। তার চোখে কৌতূহল—কিন্তু ভেতরে কোথাও একটু অস্বস্তিও।
নাচঘর: যে ঘরে সুর থেমে গেছে
নাচঘরে ঢুকতেই তারা থমকে দাঁড়াল।
শশী লজের সবচেয়ে সুন্দর হলরুমটি এখন ধুলো আর নিস্তব্ধতার রাজত্ব।
একসময় এখানে নাচের তালে সুর উঠত, অজস্র প্রদীপ জ্বলত, নরম বালিশে জমিদাররা বসে জগৎ ভুলে যেত।
এখন সব অতীত।
ছাদের থেকে ঝুলে থাকা বড় ঝাড়বাতিটি হালকা দুলছিল—কোনো বাতাস ছাড়াই।
রিফাত আঁতকে উঠল,
“ভাই… এটা নড়ছে কেন?? বাতাস তো নাই!”
তুহিন দেখানোর চেষ্টা করল না–ভয় পাওয়ার,
“ঝাড়বাতি একটু দুলতেই পারে… হালকা ভূ… মানে হালকা নড়াচড়া!”
নাবিল চারপাশ তাকাল।
“দ্বিতীয় চিহ্ন নাচঘরের নিচে। নিচে মানে—মেঝের নিচে?”
কেয়ারটেকার রহস্যময় হাসি দিয়ে বললেন,
“যারা খুঁজতে আসে… তারা পথ খুঁজে পায়।”
তারপর তিনি এক কোণে দেখালেন—
নাচঘরের মেঝেতে একটি পুরনো কাঠের পাটাতন, একটু উঁচু হয়ে আছে।
গোপন দরজা
নাবিল পাটাতনে চাপ দিতেই সেটি খট করে শব্দ করে খুলে গেল।
নিচে সরু সিঁড়ি… অন্ধকারের দিকে নামছে।
রিফাত কেঁপে উঠে বলল,
“ভাই… এখানে নামছি?? নিচটা খুবই ডার্ক লাগতেছে!”
তুহিন বলল,
“যদি নিচে টিকটিকি থাকে, নাবিল ভাগ্যিস তুমি নাই নামতেছো আগে!”
নাবিল কপালে হাত চাপড়ে বলল,
“ওইসব বলবি না!”
তুহিন হাসল। ভয়ের মধ্যে এই ছোট হাসি তিনজনের মন একটু হালকা করল।
কেয়ারটেকার বললেন,
“নামো। তোমাদের জন্যই তো অপেক্ষা করছে।”
এই ‘অপেক্ষা করছে’ কথাটা তিনজনের মনে কেমন ছুঁয়ে গেল।
নাবিল প্রথমে, তারপর তুহিন, শেষে কাঁপতে কাঁপতে রিফাত নামতে লাগল।
নাচঘরের নিচে ভূগর্ভস্থ কামরা
সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে তারা এল ছোট, অন্ধকার একটা কামরায়।
দেয়ালের ওপর মোমের আলো পড়ে দেখা গেল—
পুরনো ইট, ধুলো, আর মাঝখানে ছোট একটি পাথরের বেদি।
বেদির ওপরে রাখা—
একটি ভাঁজ করা পুরনো চিঠি।
নাবিল আলতো ছুঁয়ে চিঠিটা তুলল।
খুলতেই দেখা গেল একই চিহ্ন—
অর্ধচন্দ্রের ভেতরে ত্রিভুজ।
তুহিন বলল,
“এই চিহ্নটা পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে! নতুন লিখা মনে হচ্ছে। পুরনো কাগজে নতুন লিখা?”
রিফাত তো কেবলই কান্না চেপে রেখেছে,
“ভাই… ভূত নাকি? ভূত কি লিখতে পারে?”
নাবিল চিঠিটা খুলে পড়ল—
“তোমরা যে সত্য খুঁজছো, তা নাচঘরের নিচে নয়… বরং এই লজের রক্তে।
তৃতীয় চিহ্নটি পাবে—
‘হাত-কাটা যন্ত্রের’ পেছনের দেওয়ালে।”
তিনজন জমে গেল।
তুহিন কেঁপে উঠে বলল,
“কিন্তু আমরা তো যন্ত্রঘর ঘুরে এলাম! সেখানে তো কিছু ছিল না!”
রিফাত আবারও শ্বাস আটকাল,
“মানে… আবার যন্ত্রঘরে যেতে হবে?? ঐ হাত-কাটা যন্ত্রের কাছে!?”
নাবিল গভীরভাবে চিন্তা করল।
“আমরা যন্ত্রঘরের সামনে দাঁড়িয়েছিলাম, কিন্তু যন্ত্রের পিছনের দেয়ালটা তো দেখি নাই…”
ঠিক তখনই—
আলো নিভে গেল
মোমবাতি হঠাৎ ফুঁস করে নিভে গেল।
অন্ধকারে রিফাত চিৎকার—
“ইয়া আল্লাহ!! কে নিভাইল?? কে??”
তুহিনও কেঁপে উঠল,
“ভাই… কেউ নামছে কি সিঁড়ি দিয়ে?? শব্দ পাচ্ছি!”
নাবিল হাতড়ে ফোন বের করে লাইট জ্বালাল।
আলো জ্বলার সাথে সাথে তারা লক্ষ্য করল—
সিঁড়ির মুখের কাছে দাঁড়িয়ে আছে কেয়ারটেকার।
কিন্তু এবার তার মুখে সেই আগের হাসি নেই।
তার চোখে অদ্ভুত কঠোরতা।
তিনি ধীরে বললেন—
“তোমরা… ট্রাঙ্কটা খুলেছিলে?”
নাবিল দ্বিধায় বলল,
“জি… কিন্তু ভেতরে তো চিঠিই ছিল—”
বৃদ্ধ হঠাৎ বললেন—
“সেই ট্রাঙ্ক… ১২৫ বছর ধরে কেউ খোলেনি।”
তিনজনের গলা শুকিয়ে গেল।
রিফাত তো প্রায় জ্ঞান হারানোর অবস্থায়।
কেয়ারটেকার আরেক ধাপ এগিয়ে ফিসফিস করলেন—
“যে এই ট্রাঙ্ক খুলবে… সে-ই বংশের রহস্যের উত্তরাধিকারী হবে।
তাই তোমাদের বেরোনো এখন আর এত সহজ হবে না।”
তিনজন নিস্তব্ধ।
মনে হচ্ছে চারপাশের বাতাসই তাদের আটকে রেখেছে।
কেয়ারটেকার মুখ তুলে বললেন—
“এখন… তোমাদের তৃতীয় চিহ্ন খুঁজতেই হবে।
নইলে শশী লজ তোমাদের ছাড়বে না।”
Comments (0)
Login to leave a comment.