পর্ব–৪: তৃতীয় চিহ্ন ও জমিদার বংশের অভিশাপ
কেয়ারটেকারের চোখের দিকে তাকাতেই তুহিন, রিফাত আর নাবিলের শরীর শিউরে উঠল।
সিঁড়ির মুখে তিনি দাঁড়িয়ে আছেন, যেন বেরোনোর পথ রক্ষা করছেন।
“তোমাদের তৃতীয় চিহ্ন খুঁজতে হবে… নইলে শশী লজ তোমাদের ছাড়বে না।”
তার এই কথাটি অন্ধকার ঘরটায় আরও ঠান্ডা হাওয়া ছড়িয়ে দিল।
বেরোনোর অনুমতি
বৃদ্ধ গভীর স্বরে বললেন,
“যাও। যন্ত্রঘরে ফিরে যাও।
হাত-কাটা যন্ত্রের পেছনের দেওয়াল… সত্য লুকিয়ে আছে সেখানে।”
রিফাত কাঁপতে কাঁপতে বলল,
“ভাই… আমরা ফিরতেছি… কিন্তু প্লিজ, আপনি আমাদের সাথে আসেন না?”
তুহিন ফিসফিস করে বলল,
“কেয়ারটেকার ভাই আমাদের সাথে থাকলে মনে হয় একটু কম ভয় লাগবে… অথবা বেশি?”
বৃদ্ধ রহস্যময় হাসলেন,
“আমি সাথে থাকলে তোমরা কিছুই খুঁজে পাবে না।
শশী লজ নিজের রহস্য নিজেই তোমাদের দেখাবে।”
বলে তিনি সিঁড়ি থেকে সরে দাঁড়ালেন।
তিনজন দ্রুত সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে এল।
মনে হচ্ছে সময় যেন ধীর হয়ে গেছে।
যন্ত্রঘরে ফিরে আসা
যন্ত্রঘরে ঢুকতেই হাড় ঠান্ডা হয়ে গেল।
সেই পুরনো লোহার যন্ত্রগুলো যেন তাদের দিকে তাকিয়ে আছে।
রিফাত হাত কাঁপাতে কাঁপাতে বলল,
“কেউ কি শুনতেছে? আমার ডান চোখটা আবার টিপটিপ করছে…”
তুহিন বলল,
“চোখ টিপটিপ করা মানে নাকি বিপদ… অথবা টাকা আসবে।
কিন্তু এখানে টাকা আসবে বলে মনে হয় না।”
নাবিল গভীর নিঃশ্বাস নিল।
“ওই হাত-কাটা যন্ত্রটার পিছনে যেতে হবে।”
মোমবাতির আলোতে তারা লোহার যন্ত্রের পেছনে গিয়ে দেখল—
দেওয়ালে খোদাই করা বড় একটা চিহ্ন।
একই চিহ্ন—
অর্ধচন্দ্রের ভেতরে ত্রিভুজ
কিন্তু এবার চিহ্নের নিচে ছায়ার মতো কিছু অক্ষর।
নাবিল ধুলো হাত বুলিয়ে মুছতেই অক্ষরগুলো পরিষ্কার হলো।
তৃতীয় চিহ্নের বার্তা
দেওয়ালে লেখা—
“অপরাধ যেখানে শুরু,
সত্যের পথ সেখানেই ফিরে যায়।
চতুর্থ চিহ্ন খুঁজো—
জমিদারের গোপন কক্ষে।”
তিন বন্ধু একসাথে বলল,
“চতুর্থ চিহ্ন?”
তুহিন কান খোঁচাতে খোঁচাতে বলল,
“মানে… এটাই শেষ না? আরো আছে?”
নাবিল বাইরের কেয়ারটেকারের কথা মনে করল—
“শশী লজ নিজের রহস্য নিজেই দেখাবে…”
রিফাত হতাশ চোখে বলল,
“জমিদারের গোপন কক্ষ কোথায়?
এমন কি কোনো কক্ষ আছে নাকি এখনো?”
তুহিন ভাবল,
“ইতিহাস অনুযায়ী জমিদাররা গোপন কক্ষ রাখতো বন্দিদের লুকিয়ে রাখার জন্য…
কিন্তু এখানে কোথায় সেটা?”
ওরা যখন দেওয়াল পরীক্ষা করছিল, তখনই—
হঠাৎ সেই শব্দ
টুপ… টুপ… টুপ…
মাঝখানে কোথাও পানি পড়ার শব্দ।
তারা পেছনে তাকাল।
যন্ত্রঘরের মেঝে ভিজে উঠছে।
রিফাত কেঁপে উঠে বলল,
“ভাই… ছাদ দিয়ে পানি পড়ছে? কিন্তু আকাশ তো শুকনা ছিল!”
তুহিন চোখ ছোট করে বলল,
“…এটা পানি না।
এটা… রং? নাকি…”
নাবিল মোমবাতি কাছে নিল।
মোমের আলোতে মেঝের ওপর লালচে দাগ দেখা গেল।
রিফাতের মুখ সাদা হয়ে গেল—
“ভাই… এটা কি রক্ত??”
হঠাৎ—
যন্ত্রঘরের দরজা ধাম করে বন্ধ হয়ে গেল।
তারা ঝাঁপিয়ে দরজার দিকে তাকাল।
কেউ নেই।
কিন্তু দরজার ওপরে লেখা হয়ে গেছে নতুন একটি লাইন—
যেন কেউ অদৃশ্য হাতে স্ক্র্যাচ করে লিখেছে—
“গোপন কক্ষ—
সিঁড়ির নিচে নয়।
বরং যেখানে সুর থেমে গেছে।”
তিনজন একই সঙ্গে বুঝল—
গোপন কক্ষ নাচঘরেই।
সেখানে যেখানে ঝাড়বাতি দুলছিল…
যেখানে সুর থেমে গেছে বহু বছর আগে।
নাবিল বলল,
“চলো। এখানের রক্তের রহস্য পরে বুঝবো। এখন গোপন কক্ষ খুঁজতে হবে।”
তারা তাড়াতাড়ি নাচঘরের দিকে ছুটল।
গোপন কক্ষের দরজা
নাচঘরে ঢোকার পর আরেকবার সেই ঝাড়বাতি দুলে উঠল।
রিফাত কোণার দিকে গিয়ে বলল,
“আমরা তো এখানে নামার দরজা পেলাম… কিন্তু গোপন কক্ষ?”
নাবিল চারপাশ ভালো করে দেখছিল।
হঠাৎ তুহিন বলল,
“যেখানে সুর থেমে গেছে… মানে মিউজিক কোথায় বাজত? নাচের সময় বাজনা কোথা থেকে বাজানো হতো?”
তারা হলঘরের বাঁ পাশে এক কোণে গেল।
সেখানে পুরনো একটি কাঠের অর্গান ধুলো পড়ে আছে।
তুহিন আঙুল ছুঁতেই অর্গান টিং করে একটা নোট বাজল—
যেন এখনো জীবিত।
আর তার নিচেই দেখা গেল মেঝেতে ছোট একটা খাঁজ।
রিফাত ফিসফিস করে বলল,
“ভাই… এটা কি দরজা??”
নাবিল চাপ দিতেই খাঁজটা নড়ল।
আর ওপেন হলো এক গোপন দরজা।
ভেতরে অন্ধকার সিঁড়ি—কোথায় যায় কেউ জানে না।
হিমশিম খাওয়া রিফাত যেন কান্না আর চিৎকার একসাথে করল,
“ভাই… আর কত নিচে যাব??”
তুহিন হাসল,
“আর অল্পই… তারপর তো সত্য বের হয়ে পড়বে।
আশা করি সত্যের মুখে টিকটিকি থাকবে না!”
কেউ হাসল না এবার।
কারণ ভেতর থেকে ঠান্ডা বাতাস আসছে—
যেন বহুদিন ঘুমিয়ে থাকা কিছু এখন জেগে উঠছে।
নাবিল মোমবাতি জ্বেলে বলল,
“চলো। এটুকু যদি শেষ করতে না পারি…
তাহলে শশী লজ আমাদের ছাড়বে না।”
তিনজন ধীরে ধীরে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতে শুরু করল।
শেষ সিঁড়িতে পৌঁছানোর সাথে সাথে—
ওদের সামনে যা দেখা গেল…
Comments (0)
Login to leave a comment.