প্রিলির আগের ১০ দিন: শেষ মুহূর্তে নিজেকে কীভাবে সামলাবেন

প্রিলির আগের ১০ দিন: শেষ মুহূর্তে নিজেকে কীভাবে সামলাবেন
পরীক্ষার ঠিক আগের দশটা দিন বড় অদ্ভুত একটা সময়। কেউ বলেন, এই কদিনেই সব হবে; কেউ বলেন, যা হওয়ার তা তো আগেই হয়ে গেছে। আসলে দুটোই আংশিক সত্য। দীর্ঘদিন পড়াশোনা করা আর প্রিলি পাস করা—এ দুটো এক জিনিস না, সেটা যারা পরীক্ষা দিয়েছেন তারা ভালো করেই জানেন। শেষের এই কদিনে নিজেকে কীভাবে সাজাবেন, সেটার ওপর অনেকটা নির্ভর করে আপনি খাম বন্ধ করে বের হওয়ার পর স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলবেন, নাকি মাথায় হাত দিয়ে বসে থাকবেন।
অনেক দিন ধরেই দেখছি, শেষ মুহূর্তে এসে আমরা সবচেয়ে বেশি যেটা করি সেটা হলো ঘাবড়ে যাওয়া। আর ঘাবড়ে গিয়ে সবার আগে যেটা বাড়িয়ে দিই, সেটা হলো সাধারণ জ্ঞান পড়ার মাত্রা। যেন আরও দুই-তিনটা বই শেষ করে ফেললেই সবকিছু মাথায় ঢুকে যাবে। বাস্তবে হয় ঠিক উল্টোটা। যা পড়া ছিল সেটাও গুলিয়ে যায়। বিসিএস প্রিলি কখনোই পাণ্ডিত্যের খেলা ছিল না, এখনো নয়। এটা নার্ভের খেলা, কৌশলের খেলা।
তাই প্রথম যে কথাটা নিজেকে বলতে হবে—আগে কী পড়েছি আর কী পড়িনি, সেই হিসাব এই দশ দিনে করে কোনো লাভ নেই। বেশি পড়লেই যে প্রিলি পাস, এমন কোনো নিয়ম নেই; আবার কম পড়লেই যে ফেল, তেমনও না। যে ছেলেটা তিন বছর ধরে প্রস্তুতি নিচ্ছে, সে-ও ফেল করে; যে মেয়েটা ছয় মাস পড়ে এসেছে, সে-ও ক্যাডার হয়। পার্থক্য গড়ে দেয় শেষের এই কটা দিন আর পরীক্ষার হলের তিন ঘণ্টা।
এই দশ দিন আসলে করবেন কী
সহজ হিসাব—দশ দিনে অন্তত ১৬০ ঘণ্টা। দিনে ১৬ ঘণ্টা। কঠিন শোনাচ্ছে? মানসিকভাবে তৈরি হয়ে গেলে মোটেও না। আগে কিছু না পড়ে থাকলেও, এই ১৬০ ঘণ্টা ঠিকভাবে কাজে লাগালে প্রিলি পাস করে ফেলা সম্ভব। আর এই সময়ের সবচেয়ে বড় অংশটা দিতে হবে মডেল টেস্টকে। বাসায় বসে অন্তত ৫০ সেট মডেল টেস্ট দেওয়ার একটা পরিকল্পনা করুন। ঘড়ি ধরে, নিজেকে ঠকানো বাদ দিয়ে।
বইপত্রের দিক থেকে খুব বেশি কিছু দরকার নেই। ভালো মানের একটা প্রিলি ডাইজেস্ট, দু-একটা প্রিলি স্পেশাল সংখ্যা, প্রিলির প্রশ্নব্যাংক আর দুটো জব সল্যুশন—এর বাইরে যেতে হবে না। রেফারেন্স বই থেকে এখন একশো হাত দূরে থাকুন। ওগুলোর সময় ছিল, চলে গেছে। এখন আর সেই বিলাসিতার সুযোগ নেই।
আরেকটা জিনিস—আলোচনার চেয়ে প্রশ্ন পড়ুন বেশি। যত বেশি প্রশ্ন চোখের সামনে আসবে, প্যাটার্ন তত পরিষ্কার হবে। বাংলা আর ইংরেজি সাহিত্যের জন্য শুধু সরকারি চাকরির প্রশ্নগুলোই যথেষ্ট। ব্যাকরণ নতুন করে পড়তে যাবেন না, আগে যা পড়েছেন সেটুকুতেই আরেকবার চোখ বুলিয়ে নিন। বিজ্ঞানের জন্য প্রশ্নব্যাংক আর জব সল্যুশনই যথেষ্ট। ভূগোল, পরিবেশ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার জন্য মাধ্যমিকের সামাজিক বিজ্ঞান বইটা থেকেও কাজ চালানো যায়।
যেগুলো একদম বাদ দিন
কিছু টপিক আছে যেগুলোয় পরিশ্রম বেশি, রিটার্ন কম। সংবিধানের ধারা-উপধারা মুখস্থ করা, দেশের রাজধানী-মুদ্রার তালিকা মনে রাখা, শাখানদী-উপনদীর জটিল নাম, প্রকৃতি-প্রত্যয়ের ঝামেলা—এগুলো থেকে হয়তো এক-দুই নম্বর আসবে। সেই এক-দুই নম্বরের পেছনে দশ ঘণ্টা দেওয়ার চেয়ে অন্য কোথাও দিলে পাঁচ-ছয় নম্বর সহজেই উঠে আসবে।
যে প্রশ্নগুলোর উত্তর মাসের পর মাস চেষ্টা করেও পাচ্ছেন না, সেগুলো নিয়ে এই দশ দিনে আর ভাববেন না। যা বারবার পড়েও মাথায় থাকছে না, সেটা ছেড়ে দিন। গত পাঁচ মাসের সাধারণ জ্ঞানের আপডেট একটা গাইড থেকে এক নজর দেখে নিন—ব্যস, ওই পর্যন্তই।
মানসিক অংশটা সবচেয়ে জরুরি
পরীক্ষার দশ দিন আগে থেকে মোবাইল আর ফেসবুক থেকে যতটা সম্ভব দূরে থাকুন। হোয়াটসঅ্যাপের গ্রুপে কে কী পড়ছে, কোন বই শেষ করেছে, কোন কোচিংয়ের মডেল টেস্টে কত পেয়েছে—এসব দেখে নিজের ভেতর অহেতুক দুশ্চিন্তা ঢুকিয়ে নেওয়ার কোনো মানে নেই। যাঁদের প্রস্তুতি খুব ভালো বলে শুনেছেন, তাঁদের সঙ্গে এই কয়েকটা দিন পরীক্ষা নিয়ে কোনো কথা বলার দরকার নেই। খবরের কাগজ পড়া, টিভিতে সংবাদ দেখা—এগুলোও বন্ধ রাখুন। যা শেখার ছিল, শিখে ফেলেছেন।
রাতে হালকা খাবার খেয়ে দশটার মধ্যে ঘুমিয়ে পড়ার অভ্যাস করুন। পরীক্ষার আগের রাতে ঘুম না হলে, প্রস্তুতি যত ভালোই হোক, পরীক্ষায় তার প্রতিফলন পড়বে না। অন্তত আট ঘণ্টা ঘুম চাই-ই চাই। এটা নিয়ে আপস করার কোনো জায়গা নেই।
পরীক্ষার দিন সকাল
সকালে উঠে মিনিট পনেরো নিরিবিলি প্রার্থনা করুন। মনটা শান্ত হবে। এরপর ফ্রেশ হয়ে হালকা নাশতা। বেরোনোর সময় হাতে রাখুন সময়—বই নয়। শেষ মুহূর্তে বই উল্টে কিছু দেখে নেব, এই ভাবনাটা মাথা থেকে সরিয়ে দিন। ওতে লাভের চেয়ে ক্ষতি বেশি। যেটুকু পারেন, ওটুকুই আপনার সম্পদ। কলম, অ্যাডমিট কার্ড, প্রবেশপত্র, ঘড়ি—সব ঠিকঠাক আছে কি না দেখে তবেই বের হন।
হলে ঢুকে একটা কথা নিজেকে বলুন—আমিই এখানে সবচেয়ে ভালো পরীক্ষা দিচ্ছি। এই একটা বিশ্বাস যাদুর মতো কাজ করে। পাশের বেঞ্চে বসা লোকটা কয়টা দাগাল, কোনটা দাগাল—ওদিকে চোখ যাবে না। চোখ গেলেই যা জানেন সেটাও ভুল হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়।
উত্তরপত্র ভরাট করার সময়
সবার আগে সেট কোড আর বাকি তথ্য ঠিকভাবে পূরণ করুন। এই জায়গায় ভুল মানে সব শেষ—পরীক্ষা যতই ভালো হোক। এরপর প্রশ্ন ধরুন। মনে রাখবেন, সব প্রশ্ন উত্তর করার জন্য দেওয়া হয়নি। লোভ করলেই নেগেটিভ মার্কিংয়ের ফাঁদে পা। যেগুলো একদম জানেন, সেগুলো আগে। যেগুলোর উত্তর প্রথম দেখায় মাথায় আসছে না, মার্ক করে এগিয়ে যান। দ্বিতীয়বার ফিরে এলে অনেক সময় উত্তর চট করে মনে পড়ে।
মানসিক দক্ষতা আর নৈতিকতার অংশে কনফিউজিং প্রশ্নগুলোয় যাবেন না। ওগুলোর উত্তর সাধারণ জ্ঞানের মতোই—পারলে হবে, না পারলে ছেড়ে দেওয়াই শ্রেয়। গাণিতিক যুক্তিতে পাটিগণিত ছাড়া বাকি অংশ ভালোভাবে প্র্যাকটিস করা থাকলে এখান থেকে ভালো সংখ্যক নম্বর ওঠে।
কিছু প্রশ্ন বুদ্ধি খাটিয়ে ছেড়ে আসতে হয়—এটা ঠিক। কিন্তু অতিরিক্ত ছেড়ে আসাটাও বোকামি। ছয়টা প্রশ্ন ছেড়ে শূন্য পাওয়ার চেয়ে তিনটায় সঠিক ধরে দেড় নম্বর তোলা অনেক ভালো। কয়টা দাগালে পাস, এমন কোনো হিসাব নেই। যেগুলো পারেন সব দাগান। যেগুলো একদম পারেন না সেগুলো বাদ। বাকি মাঝারি ক্যাটাগরির প্রশ্নগুলোর ষাট শতাংশের মতো উত্তর করতে পারেন—এটা মোটামুটি নিরাপদ হিসাব।
পরীক্ষার প্রশ্ন সঠিক হলো না ভুল হলো, সেটা হলে বসে ভাবার জিনিস না। ওটা পরে দেখা যাবে। প্রতিটা প্রশ্নে এক নম্বর, কোনোটায় বাড়তি গুরুত্ব দিতে যাবেন না। বৃত্ত ভরাট করতে করতে ক্লান্ত লাগলে এক মিনিট চোখ বন্ধ করুন। চাকরিটা পেয়ে গেলে জীবনটা কেমন দেখাবে, বাবা-মায়ের মুখের হাসিটা কেমন হবে—এই ছবিটা কল্পনায় আনুন। ক্লান্তি মিলিয়ে যাবে।
শেষ কথা
বিসিএস প্রিলি শুধু পড়ার পরীক্ষা না—মাথা ঠান্ডা রাখার পরীক্ষা। যিনি শেষ মুহূর্তে নিজেকে সামলাতে পারেন, তিনিই এগিয়ে যান। পরিচয় দেওয়ার মতো একটা চাকরি সবারই হোক। সিভিল সার্ভিসে আপনাকে আগেভাগেই স্বাগত জানিয়ে রাখলাম।
Comments (0)
Login to leave a comment.