রক্তাক্ত বগুড়া ও বিজয়ের নতুন সূর্য: একজন এইচএসসি পরীক্ষার্থীর চোখে জুলাই-আগস্ট
১ জুলাই ২০২৪; বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসগুলো যখন কোটা সংস্কারের দাবিতে প্রথম গর্জে উঠেছিল, তখনো আমরা কেউ ভাবিনি এই জুলাই আমাদের জীবনের মোড় এভাবে ঘুরিয়ে দেবে। দিন যত গড়াচ্ছিল, ছাত্রদের সাধারণ দাবিটি ধাপে ধাপে রূপ নিচ্ছিল পুরো ছাত্র-জনতার ৯ দফা এবং পরবর্তীতে স্বৈরাচার পতনের এক দফার এক ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানে।
১৬ই জুলাই আমার পরীক্ষা ছিল বগুড়া পুলিশ লাইন্স কেন্দ্রে। পরীক্ষা দিয়ে বের হতেই দেখি পলিটেকনিকের শিক্ষার্থীদের এক বিশাল মিছিল। বুকের ভেতর চেপে রাখা আবেগ আর ধরে রাখতে পারলাম না, নিজের অজান্তেই মিছিলে পা মেলালাম। সরকারি শাহ সুলতান কলেজ পর্যন্ত গিয়ে মনকে কোনোমতে শান্ত করে মেসে ফিরে এলাম—সামনে আরও পরীক্ষা, ফিরতেই হবে।
আমি থাকতাম শহরের একটি চাকরিজীবী মেসে। আমাদের চার ছাত্রের মধ্যে সাব্বির আর জিহান—সাতমাথায় ককটেল ফুটছে ও গুলি চলছে শুনে আতঙ্কিত হয়ে গ্রামে চলে গেল। আমার পরম বন্ধু শাহীও ১৮ তারিখে বাড়ি ফিরল। পুরো মেসে ছাত্রদের মধ্যে আমি একাই রয়ে গেলাম। ১৮ই জুলাই আন্দোলনের সমন্বয়করা দেশব্যাপী ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ ঘোষণা করলেন। ওইদিনই উত্তরায় পুলিশের গুলিতে শহীদ হলেন মীর মুগ্ধ—যার "পানি লাগবে কারো, পানি?" ডাকটি আমাদের স্তব্ধ করে দিয়েছিল। ওই রাতেই সরকার মোবাইল ও ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট পুরোপুরি বন্ধ করে দেয় এবং ১৯ই জুলাই মধ্যরাত থেকে জারি করা হয় কঠোর মিলিটারি কার্ফিউ। চারপাশ তখন থমথমে বারুদের গন্ধ আর সামরিক যানগুলোর শব্দে ভারী। এরই মধ্যে আমাদের এইচএসসি পরীক্ষা ধাপে ধাপে ১১ই আগস্ট পর্যন্ত স্থগিত হয়ে একপর্যায়ে অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ হয়ে গেল। মন থেকে মস্ত বড় পাথর নেমে গেল; সাতমাথায় যাওয়ার আর কোনো বাধা রইল না।
এক শুক্রবারের কথা, বাইরে তখন ঝুম বৃষ্টি। মনে তীব্র জেদ—আজ মিছিলে যাবই। তাই সুন্দর একটি সাদা পাঞ্জাবি পরে সুবিল মসজিদে জুমার নামাজ পড়তে গেলাম, যেন নামাজ শেষেই সরাসরি রাজপথে যোগ দিতে পারি। কিন্তু নামাজ শেষে ফোন হাতে নিয়ে বড় ভাইদের একটি জরুরি নির্দেশনা দেখে থমকে গেলাম। সেখানে লেখা ছিল—"কেউ পাঞ্জাবি-টুপি পরে মিছিলে আসবেন না। সাধারণ টি-শার্ট পরুন। পাঞ্জাবি-টুপি গায়ে থাকলে পুলিশ জামাত-শিবির সন্দেহে বেশি মারবে এবং টার্গেট করবে।" একটা স্বাধীন দেশে নিজের ধর্মীয় পোশাক পরে মিছিলে যাওয়ার অধিকারটুকুও কেড়ে নেওয়া হয়েছিল স্বৈরাচারের ভয়ে! বুকের ভেতর এক তীব্র ক্ষোভ চেপে সেদিন আর সাদা পাঞ্জাবি পরে রাজপথে যাওয়া হলো না, মেসে ফিরে সাধারণ পোশাক পরে বের হতে হলো।
মসজিদ থেকে বের হওয়ার সময় আরেকটি দৃশ্য আমার চোখ আটকে দিয়েছিল—দুই-তিনজন মহিলা তিনটি ছোট মেয়েকে সাথে নিয়ে যাচ্ছেন, মেয়েগুলোর মাথায় লাল কাপড় বাঁধা। দৃশ্যটি দেখে নিজের ভেতর তীব্র আত্মধিক্কার জন্ম নিল। তড়িঘড়ি করে মেসে ফিরে সনি ভাইকে বললাম, "ভাই, চলেন যাই।" সনি ভাই আমার অনেক সিনিয়র হলেও আমাদের সম্পর্কটা ছিল অত্যন্ত হৃদয়ের। বগুড়ার রাজপথে আমরা দুজন একসাথে অনেক পথ চলেছি। সনি ভাই রাজি হলেন। এরপর থেকে যখনই মিছিলের ডাক আসত, আমরা দুজন সব বাধা পেরিয়ে ছুটে যেতে লাগলাম।
মিছিলে গিয়ে মনের তাগিদেই দুই-চারটা ছবি তুলতাম ঠিকই, কিন্তু সেগুলো গ্যালারিতে স্বাভাবিকভাবে রাখার সাহস ছিল না। ছবিগুলো ফোনের একটি সিক্রেট ফোল্ডারে পাসওয়ার্ড দিয়ে লুকিয়ে রাখা লাগত। কারণ তখন যেকোনো সময় রাস্তায় দাঁড়িয়ে সাধারণ পথচারী কিংবা ছাত্রদের ফোন কেড়ে নিয়ে চেক করত পুলিশ। যদি কোনোভাবে ফোনের ভেতর আন্দোলনের একটা ছবিও দেখতে পেত, তবেই শেষ—কপালে কী নির্মম নির্যাতন জুটত তা ভাবলেও গা শিউরে ওঠে। মনের ক্ষোভ থেকে এই দিনগুলোতেই লিখে ফেললাম ‘মেধা শহীদ’, ‘২য় স্বাধীনতা’ ও ‘রক্তাক্ত বগুড়া’র মতো কিছু কবিতা। মেসের বড় ভাই সেলিম ভাই কবিতাগুলো পড়ে খুব প্রশংসা করেছিলেন। তবে পরিস্থিতি এতটাই থমথমে ছিল যে, আমার কবিতা লেখার খাতাটিও সবসময় ঘরের বইয়ের তাকের মাঝে লুকিয়ে রাখতাম।
চারপাশের সব মেস ফাঁকা হওয়ায় সবাই ভাবত আমার থাকাটা ঝুঁকিপূর্ণ। মেসের সেলিম ভাই আর আইনুল ভাই আমাকে বাড়ি চলে যেতে বললেন। একদিন মেস মালিক ফোন করে বড় ভাইকে বললেন যে, আজ রাতে মেসে পুলিশ আসতে পারে। আতঙ্ক আর উৎকণ্ঠায় বুকটা কেঁপে উঠল। তখন আমার প্রিয় বন্ধু হাবো-কে ফোন করে বললাম, "হাবো, আজ রাতে মেসে police আসতে পারে। যদি আমার কিছু হয়ে যায়, তুই প্লিজ আমার বাসায় একটু বুঝিয়ে বলিস।" এরপর পাশের রুমের রবিউল ভাইকে আমার রুমের তালাটা দিয়ে বললাম, "ভাই, পুলিশ আসলে তালা মেরে বইলেন এই রুমের ছেলে বাড়ি চলে গেছে।" রাতে ঘুমানোর আগে দরজার বাইরের জুতো জোড়াও ঘরের ভেতরে এনে রাখতাম।
৪ঠা আগস্ট বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন থেকে ‘সর্বাত্মক অসহযোগ’-এর ঘোষণা করা হলো। দুপুরের পর থেকে আবার ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট করে দেওয়া হলো, বন্ধ হয়ে গেল সব যোগাযোগ। এই ৪ঠা আগস্ট ছিল এক অবিস্মরণীয় দিন। মহাস্থান, মোকামতলা, মাটিডালি থেকে মানুষের ঢল নামল—সে এক অভূতপূর্ব জনসমুদ্র! আমি, সনি ভাই আর স্থানীয় কয়েকজন রওনা দিলাম। কিন্তু কালিতলা আসতেই চারদিক থেকে ককটেল আর গুলির শব্দে চারপাশ প্রকম্পিত হয়ে উঠল। পুলিশ নির্বিচারে ধাওয়া দিচ্ছিল, গুলি চালানো হচ্ছিল। একজন গুলি খেয়ে পড়ে গেলেই অন্যজন তাকে কোলে করে নিরাপদ স্থানে নিয়ে আসছিল। ধাওয়ার সময় দৌড়াতে গিয়ে আমার জুতোও ছিঁড়ে গিয়েছিল।
৫ই আগস্ট দুপুরের দিকে খবর ছড়িয়ে পড়ল, বেলা আড়াইটার দিকে শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন! এই খবরটি পাওয়ার সাথে সাথে মানুষের মনে যে কী এক বাঁধভাঙা আনন্দ-উল্লাস তৈরি হলো, তা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। তবে এই মহা বিজয়ের পরপরই আরও একটি খবর শুনে আমার শরীর ঠান্ডা হয়ে গিয়েছিল। জানতে পারলাম, আমি আর সনি ভাই সহ মেস থেকে যারা যারা মিছিলে যেতাম, আমাদের সবার নাম নাকি গোপনে কে বা কারা পুলিশের তালিকায় তুলে দিয়েছিল! বুকের ভেতর এক ঠান্ডা স্রোত বয়ে গেল। ভাবলাম, এই ৫ই আগস্ট যদি এই কাঙ্ক্ষিত বিজয় অর্জিত না হতো, তবে হয়তো আজ আমরা স্বাধীন বাতাসে শ্বাস নিতে পারতাম না; আমাদের ঠিকানা হতো অন্ধকার কোনো কারাগার কিংবা অজানা কোনো গুমঘর।
কিন্তু ভাগ্যিস, বিধাতা অন্যকিছু লিখে রেখেছিলেন। আমরা সব ভয় ভুলে বিজয় মিছিল নিয়ে সাতমাথার দিকে রওনা দিলাম। চোখে নতুন এক বাংলাদেশের স্বপ্ন। মিছিলটি যখন থানার সামনে পৌঁছাল, তখনো পুলিশদের বন্দুকে তীব্র হিংস্রতা। এর মধ্যেই আমার বন্ধু আরমান ফোন করে বলল, "মাসুম কই?" বললাম, "সাতমাথায় চলে আয়।" সে বলল, "আসতেছি, কালিতলা পার হয়েছি।" পরবর্তীতে জানতে পারলাম, থানার সামনে আসতেই হঠাৎ পুলিশ ছররা গুলি চালাতে শুরু করে, যার আঘাত আরমানের সাথে থাকা ওর বন্ধুর পিঠে গিয়ে লাগে। আরমান তার বন্ধুকে নিয়ে হাসপাতালের দিকে ছুটে গেল, বিজয় মিছিলে আর যোগ দিতে পারল না।
মেসে ফেরার পথে পাশের বাসার পাঁচতলার ছাদে দেখলাম দুইটা ছোট ছেলে (৮ম-৯ম শ্রেণিতে পড়ে)। তাদের হাতে বেশ দামি পানির বোতল। আমাদের দেখে হাসিমুখে বলল, "ভাইয়া, পানি খাবা?" কথাটি শুনে আমি একটু থমকে গেলাম। এই বয়সের বাচ্চাদের হাতে এমন দামি বোতল দেখে পরে মনে হলো, গণঅভ্যুত্থানের ওই উত্তাল মুহূর্তে হয়তো কোনো বড় নেতার অফিস বা দলীয় কার্যালয় থেকে ওগুলো কুড়িয়ে পেয়েছে। মনের ভেতরের সব ক্লান্তি আর আতঙ্ক ছাপিয়ে তখন ঠোঁটের কোণে একটুখানি হাসির রেখা ফুটে উঠল। এভাবেই অনেক রক্ত, অনেক আতঙ্ক, ইন্টারনেটহীন গভীর অনিশ্চয়তা আর সাধারণ মানুষের অভূতপূর্ব ত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত হলো আমাদের দ্বিতীয় স্বাধীনতা।
লেখাঃ মোঃ আব্দুল্লাহ আল মাসুম
জেলাঃ বগুড়া
শিক্ষার্থীঃ নেত্রকোণা বিশ্ববিদ্যালয়
মোবাঃ ০১৩২৬৫৬৩৮৮১
Comments (0)
Login to leave a comment.