“রক্তের রঙে লেখা ভোর”.....!!

১৯৭১ সালের মার্চ মাস। চারদিকে অদ্ভুত এক উত্তেজনা, ভয় আর অজানা ভবিষ্যতের অপেক্ষা। ঢাকার আকাশ যেন ভারী হয়ে আছে—যেন সে নিজেও জানে, সামনে কী ভয়াবহ সময় আসছে।
শামিম তখন মাত্র কলেজে পড়ে। বয়স বেশি না, কিন্তু চোখে স্বপ্ন ছিল বড়—একটা স্বাধীন দেশের স্বপ্ন। তার বাবা, আব্দুল করিম, ছিলেন একজন স্কুল শিক্ষক। সাদামাটা মানুষ, কিন্তু ভিতরে ছিল অদম্য সাহস।
২৫ মার্চের সেই রাত…
চারদিকে হঠাৎ গুলির শব্দ। আগুনের লেলিহান শিখা আকাশ ছুঁয়ে যাচ্ছে। মানুষ দৌড়াচ্ছে, চিৎকার করছে, কেউ জানে না কোথায় যাবে। শামিম তার মায়ের হাত শক্ত করে ধরে ছিল।
“বাবা কোথায়?” শামিম কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করল।
তার মা, চোখে পানি নিয়ে বললেন, “তোমার বাবা বাইরে গেছে… মানুষের সাহায্য করতে।”
কিন্তু সেই রাতেই তাদের জীবন বদলে গেল।
ভোর হওয়ার আগেই খবর এল—আব্দুল করিম আর ফিরবেন না। তিনি গুলিবিদ্ধ হয়ে শহীদের কাতারে নাম লিখিয়েছেন।
শামিমের মনে হলো, তার ভেতরের একটা অংশ যেন চিরতরে ভেঙে গেল। কিন্তু সেই ভাঙা জায়গাতেই জন্ম নিল নতুন এক আগুন—প্রতিশোধের না, স্বাধীনতার।
---
পরের দিনগুলোতে শামিম আর ঘরে বসে থাকতে পারল না। সে যোগ দিল মুক্তিযুদ্ধে। বয়স কম হলেও তার চোখের দৃঢ়তা দেখে কেউ তাকে ফিরিয়ে দিতে পারল না।
ট্রেনিং ক্যাম্পে গিয়ে সে শিখল—কীভাবে অস্ত্র ধরতে হয়, কীভাবে নিজের ভয়কে জয় করতে হয়।
একদিন রাতে, তার সহযোদ্ধা রফিক তাকে জিজ্ঞেস করল,
“তুই ভয় পাস না?”
শামিম একটু হাসল।
“ভয় পাই… কিন্তু বাবার কথা মনে পড়লে ভয় পালিয়ে যায়।”
---
যুদ্ধ চলতে লাগল দিনরাত। একেকটা দিন যেন একেকটা বছর।
একদিন তাদের দায়িত্ব পড়ল একটি গ্রাম মুক্ত করার। গ্রামটিতে পাকিস্তানি সেনারা অবস্থান নিয়েছিল। চারদিকে আতঙ্ক।
শামিম আর তার দল রাতে আক্রমণ করার সিদ্ধান্ত নিল।
রাত গভীর হলে তারা এগিয়ে গেল। চারদিকে নিস্তব্ধতা—কিন্তু সেই নিস্তব্ধতার ভেতরে লুকিয়ে ছিল মৃত্যু।
হঠাৎ গুলির শব্দ!
চারদিকে গোলাগুলি শুরু হয়ে গেল। শামিম নিজের অবস্থান থেকে গুলি চালাতে লাগল। তার হাত কাঁপছিল, কিন্তু সে থামেনি।
হঠাৎ সে দেখল—একজন বৃদ্ধ মহিলা একটা ঘরের কোণায় বসে কাঁদছেন।
শামিম নিজের জীবন ঝুঁকিতে ফেলে তাকে উদ্ধার করতে গেল।
“চলুন, আপনাকে এখানে রাখা যাবে না!” সে বলল।
মহিলা কাঁদতে কাঁদতে বললেন, “আমার ছেলে… ওরা নিয়ে গেছে…”
শামিম কিছু বলল না। শুধু তার হাত ধরে নিরাপদ জায়গায় নিয়ে গেল।
---
যুদ্ধ শেষ হতে অনেক সময় লাগল।
অনেক রক্ত, অনেক কান্না, অনেক ত্যাগের পর…
১৬ ডিসেম্বর।
বাংলাদেশ স্বাধীন হলো।
সেই দিন, শামিম দাঁড়িয়ে ছিল এক খোলা মাঠে। চারদিকে মানুষের উল্লাস, আনন্দ, কান্না—সব একসাথে।
কিন্তু তার চোখে পানি ছিল অন্য কারণে।
সে আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল,
“বাবা, আমরা পেরেছি…”
---
বছর কেটে গেল।
শামিম এখন একজন শিক্ষক। ঠিক তার বাবার মতো। প্রতিদিন ক্লাসে গিয়ে সে ছাত্রদের শুধু বইয়ের পড়া শেখায় না—শেখায় ইতিহাস, শেখায় ত্যাগের মূল্য।
একদিন, এক ছাত্র তাকে জিজ্ঞেস করল,
“স্যার, স্বাধীনতা এত গুরুত্বপূর্ণ কেন?”
শামিম একটু থামল। তার চোখে ভেসে উঠল সেই রাত, সেই যুদ্ধ, সেই রক্ত।
সে ধীরে ধীরে বলল,
“কারণ এই স্বাধীনতা আমাদের রক্ত দিয়ে কেনা… তোমার আমার মতো হাজারো মানুষের ত্যাগের বিনিময়ে পাওয়া।”
---
সেই দিন ক্লাস শেষে শামিম একা বসে ছিল।
হঠাৎ তার মনে হলো—স্বাধীনতা শুধু একটা শব্দ না, এটা একটা অনুভূতি, একটা দায়িত্ব।
যে দায়িত্ব আমাদের মনে করিয়ে দেয়—এই দেশটা শুধু মাটি না, এটা আমাদের অস্তিত্ব।
Comments (0)
Login to leave a comment.