রক্তিম জুলাইয়ের মহাকাব্য: একটি নতুন ভোরের জন্ম
ঢাকার রাস্তাগুলো যেখানে রিকশার ঘণ্টাধ্বনির ঝাঁঝা ছিল জুলাই মাসের মাঝামাঝি সময়ে ভারী ঝঞ্ঝা শ্বাসরুদ্ধকর নীরবতা এবং তারপর দেশের ভিত্তি পর্যন্ত টন টন গর্জনে পরিণত হলো।
ধোঁয়ার মাঝে এক আশ্রয়স্থল
আনিছ আহমেদ ছিলেন একজন রাজনীতিবিদ কৌশলবিদ বা ছাত্রনেতা নয় বরং ৫২ বছর বয়সী এক চা বিক্রেতা। ৫২ বছর বয়সে বিশ্ববিদ্যালয়ের মোড়ের কাছে তার ছোট কাঠের চা দোকানের চার দেয়ালের বাইরে তার দুনিয়া ছিল আর দশক ধরে কনডেন্সড মিল্কের দাম ওঠানামা ছিল তার সবচেয়ে বড় উদ্বেগ। কিন্তু জুলাই মাসেই বদলে যায় তাদের অস্তিত্বের হিসাব নিকাশ। একদিন ছাত্র আন্দোলন যখন চরম আকার নিয়েছে আনিস তার চায়ের দোকানে বসে দেখেছে তার ছেলের সমবয়সী কিশোররা রোদের তাপে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়িয়ে আছে একটি ন্যায়সঙ্গত আগামী দাবি করছে। দমন শুরু হলে এবং বাতাস অশ্রু গ্যাসের গন্ধে ভারী হয়ে গেলে আনিস লোহার শাটার নামিয়ে পালিয়ে যাননি। তিনি পারলেন না।
"ওরা তো শুধু বাচ্চা প্লাস্টিকের কাপগুলোতে ফুটন্ত পানি ঢালতে ঢালতে তিনি ফিসফিস করে নিজেকে বললেন তার হাতগুলো কাঁপছিল। যদি ওরা আমাদের ভবিষ্যতের জন্য ওখানে দাঁড়াতে পারে তাহলে আমি অন্তত ওদের বাঁচিয়ে রাখতে পারি।"
তার চায়ের দোকান এখন বাজারের অস্থায়ী মেডিকেল টেন্টে পরিণত হয়েছে। যখন টিয়ার গ্যাসের শিকার হয়ে মিছিলকারীরা অন্ধ হয়ে যায় আনিস ফুটপাতে পানি এবং পরিষ্কার কাপড়ের বালতি নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন এবং অপরিচিতদের চোখ থেকে জ্বালা ধরা রাসায়নিকগুলো সাবধানে মুছে দিচ্ছেন। তিনি বিস্কুট লেবু আর পানি বিতরণ করতেন আর তার কাছে যে প্রতিটি টাকা অফার করা হতো তা ফিরিয়ে দিতেন। ধোঁয়ার মাঝে তার ছোট বিক্রয়কেন্দ্রটি যেন একটি আলোকবর্তিকা হয়ে উঠেছিল।
তিন চাকার লাইফলাইন
জুলাই মাসের শেষ নাগাদ এটি সংস্কারের দাবিতে হওয়া একটি প্রতিবাদ থেকে ধীরে ধীরে গভীরভাবে প্রোথিত এক বিদ্রোহে রূপ নিয়েছিল যে গণঅভ্যুত্থানকে আর দমন করা যাচ্ছিল না। যে ভয় জাতিকে আচ্ছন্ন করেছিল তা বছর বছর ধরে উবে যাচ্ছে তার জায়গা করে নিচ্ছে অসাধারণ একতা। এমনই এক মঙ্গলবার বিকেলে ফ্লাইটটি প্রায় বিশৃঙ্খল হয়ে উঠলে ভীতসন্ত্রস্ত একদল শিক্ষার্থী আনিসের গলির দিকে এগিয়ে যায়। তাদের মধ্যে একজন ছিল এক তরুণ চিকিৎসাবিদ্যা ছাত্র ফাহিম যে আহত এক সহপাঠীকে নিরাপদ স্থানে টেনে নেওয়ার চেষ্টা করছিল। এক ছেলেকে শটগানের গুলির আঘাতে বিদ্ধ করা হয়েছিল এবং তার পা দিয়ে রক্ত ঝরছিল। ফাহিম ডাকবার আগেই একটি গাড়ি এসে থামল। গাড়ি চালাচ্ছিল জাহাঙ্গীর। সে ছিল রোগা। তার মুখ ছিল শক্ত। অনেক বছর ধরে সে রোদ ও কঠিন কাজ করেছে। তাড়াতাড়ি ওকে পেছনে বসান। ঝটপট। ফ্ল্যাশব্যাকের শব্দ দূর থেকে আসছিল। জাহাঙ্গীর চিৎকার করে এটা বলল। সামনে ভালোই বিপদ মামা। তারা হাসপাতালের পথ সব আটকে দিয়েছে। কপালের ঘাম আর ময়লা মুছে চেঁচিয়ে উত্তর দিল ফাহিম। আবার সে দ্বিধার মধ্যে পড়ল না। সে যে ছেলেটি রক্ত হারাচ্ছিল তার দিকে তাকাল। তারপর ফাহিমের দিকে। তার মুখ শক্ত হলো। আমি এই সব পথ চিনি। জাহাঙ্গীর এমন কথা বললেন। তাঁর গলায় একটুও ভয় ছিল না। তিনি বলেন যদি মরতেই হয় তবে একসাথে মরব। আমি এই বন্ধুকে মরতে দেব না। রাস্তা সব বন্ধ। জাহাঙ্গীর জোর দিয়ে প্যাডেল মারলেন। সরু মাটির পথ। ভাঙা ইট। রিকশা চালালেন। তিনি কারফিউ মানলেন না। তিন চাকায় তিনি জীবন হয়ে চললেন। তাদের পেছনে সাধারণ লোক। গেটের সামনে দাঁড়ানো। জলের বোতল দিল। যারা ভয় পেয়েছে তাদের দরজা খুলে দিল। বারান্দা থেকে উৎসাহ দিল।
ভোরের ক্যানভাস
অনেক সাধারণ লোক যারা ভয় পায়নি তারা জিতেছে। আনিস জাহাঙ্গীর এবং মায়েরা তারা ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছিল। তারা সব দিয়ে দিয়েছিল। এই সাহসী লোকগুলো এক বড় জয় এনে দিয়েছিল। জুলাই মাসের ৩৬ দিন দেখিয়ে দিয়েছিল যে যখন সব লোক ভয় কাটিয়ে ওঠে তখন কিছুই তাদের আটকাতে পারে না।
যখন আশা জয়ের পথে মানুষের মন সেই দিন ”জুলাই ৩৬” মনে রাখল সেই দিন যেন সময় থেমে গিয়েছিল নতুন এক কাহিনি লেখা হবে।
কিছু দিন পরে আনিসের চায়ের দোকান চালু হলো। দেখতে একই রকম ছিল তবে চারপাশের জগৎ সম্পূর্ণ পাল্টে গিয়েছিল। চারপাশটা হালকা লাগছিল; বাতাস আরও বেশি সতেজ মনে হচ্ছিল যাতে অজানা চিন্তার ভার ছিল না।
ফাহিম চৌরাস্তায় এল। তার হাত ব্যান্ডেজ ছিল। সে হেসে উঠল। ফাহিম আনিসের কাছে গেল। সে বুড়োকে জড়িয়ে ধরল। জাহাঙ্গীরও সেখানে ছিল। তার রিকশা পাশে দাঁড়ানো। রিকশায় ফুল ছিল। সুন্দর গাঁদা ফুল। বাতাসে বাংলাদেশের পতাকা উড়ছিল।
দেওয়ালগুলো দেখল যা শত শত ছাত্রের হাতে বদলে যাচ্ছিল। দাগ-ধরা ধূসর কংক্রিট ঢেকে গিয়েছিল নতুন আশা মুক্তি আর একতার অনেক ছবির। বীরদের ত্যাগের কথা মনে করে কষ্ট দূর হল আর বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ হাত ধরে পার হল। তারা এক নতুন দিনে প্রবেশ করল।
Comments (0)
Login to leave a comment.