“রঙের ভিড়ে হারিয়ে যাওয়া এক বৈশাখ".....

ঢাকার সকালটা সেদিন অন্য দিনের মতো ছিল না। আকাশে ছিল নরম রোদ, বাতাসে ছিল ঢাকের শব্দের মতো এক অদ্ভুত উৎসবের গন্ধ। আমি আর আমার বন্ধু রাহাত বের হলাম “মঙ্গল শোভাযাত্রা” দেখার জন্য।
রাস্তার দু’পাশে রঙিন মুখোশ, পাপেট আর হাতির বিশাল প্রতিকৃতি—সব মিলিয়ে মনে হচ্ছিল যেন কোনো স্বপ্নের ভেতর হাঁটছি। লাল-সাদা পোশাকে মানুষ, কারও হাতে বাঁশি, কারও হাতে পতাকা। কেউ গান গাইছে, কেউ আবার ঢাক বাজাচ্ছে। সবাই যেন একটাই ভাষায় কথা বলছে—“বৈশাখের আনন্দ”।
রাহাত হঠাৎ বলল, “দেখ, এই যে মানুষগুলো, এদের মাঝে কোনো ভেদাভেদ নেই। ধনী-গরিব সবাই একসাথে হাসছে।” আমি মাথা নেড়ে সম্মতি দিলাম। সত্যিই, এই শোভাযাত্রা শুধু একটা র্যালি না—এটা বাঙালির হৃদয়ের রঙ।
শোভাযাত্রা শেষ করে আমরা গেলাম পান্তা-ইলিশের আয়োজন দেখতে। চারদিকে বাঁশের চাটাই, মাটির হাঁড়ি, আর লবণ-লঙ্কা দিয়ে সাজানো পান্তা ভাত। পাশে ভাজা ইলিশের ঘ্রাণ বাতাসে ভেসে আসছে। মানুষ সারি বেঁধে খাচ্ছে, হাসছে, গল্প করছে।
এক বৃদ্ধ লোক বললেন, “বাবা, এই দিনটা আমাদের ঐতিহ্য। আমরা ভুলে যাই না আমরা কারা।” তার চোখে ছিল এক ধরনের গর্ব।
বিকেলে গেলাম বৈশাখী মেলায়। চারদিকে বাঁশের দোকান, খেলনা, মাটির পুতুল, হাতে বানানো গয়না—সব কিছুতেই যেন গ্রামবাংলার প্রাণ লুকিয়ে আছে। ছোট শিশুরা ঘুড়ি কিনছে, কেউ আবার নাগরদোলায় চড়ছে। মেলার মাঝখানে একজন বাউল গান গাইছিল—
“এসো হে বৈশাখ, এসো এসো…”
আমি থমকে দাঁড়িয়ে গেলাম। মনে হলো, এই গান শুধু কান দিয়ে শোনা যায় না, হৃদয় দিয়ে অনুভব করতে হয়।
সন্ধ্যা নামতেই আকাশে রঙ মিশে গেল। আলো-আঁধারির সেই মুহূর্তে মনে হলো, এই শহরটা আজ শুধু ঢাকা না—এটা একটা রঙিন স্বপ্ন।
আমি রাহাতকে বললাম, “আমরা হয়তো এই দিনটা ভুলে যাব না কখনো।” সে হেসে বলল, “না রে, এটা শুধু দিন না, এটা আমাদের পরিচয়।”
সেদিন বুঝেছিলাম, মঙ্গল শোভাযাত্রা শুধু শোভাযাত্রা না, পান্তা-ইলিশ শুধু খাবার না, আর মেলা শুধু বিনোদন না—এগুলো আমাদের সংস্কৃতির প্রাণ, আমাদের বাঙালিত্বের গল্প।
Comments (0)
Login to leave a comment.