"রঙিন ভোরের সেই দিন"
পহেলা বৈশাখ মানেই আমার কাছে এক অদ্ভুত উচ্ছ্বাস, নতুন করে বাঁচার অনুপ্রেরণা। ছোটবেলা থেকে এই দিনটার জন্য আমি সারা বছর অপেক্ষা করতাম। কিন্তু ১৪২৮ সালের পহেলা বৈশাখটা আমার জীবনের সবচেয়ে স্মরণীয় হয়ে আছে।
সেদিন ভোরে ঘুম ভাঙতেই কানে ভেসে আসছিল ঢোলের শব্দ, সাথে ভোরের ঠান্ডা বাতাস। মা নতুন পাঞ্জাবি এগিয়ে দিয়ে বললেন, “তাড়াতাড়ি তৈরি হও, মঙ্গল শোভাযাত্রা মিস করো না।” লাল-সাদা পাঞ্জাবি পরে আয়নায় নিজেকে দেখে মনে হচ্ছিল আমি যেন নতুন এক আমি।
বাবার হাত ধরে আমরা বের হলাম। চারদিকে মানুষের ঢল—সবাই লাল-সাদা পোশাকে, মুখে আনন্দের হাসি। রাস্তায় রঙিন মুখোশ, হাতে পাখা, আর ছোট ছোট বাচ্চাদের হাসি—সব মিলিয়ে এক অন্যরকম পরিবেশ। মঙ্গল শোভাযাত্রার বিশাল মুখোশগুলো দেখে আমি অবাক হয়ে গিয়েছিলাম। যেন ইতিহাস আর সংস্কৃতি জীবন্ত হয়ে উঠেছে।
হঠাৎ ভিড়ের মধ্যে আমি বাবার হাতটা হারিয়ে ফেললাম। চারদিকে এত মানুষ যে আমি কিছুই বুঝে উঠতে পারছিলাম না। বুকের ভিতরটা ধকধক করতে লাগল। ভয় আর অজানা আতঙ্কে চোখে পানি চলে এলো। আমি দৌড়াতে লাগলাম, কিন্তু কোথাও বাবাকে খুঁজে পেলাম না।
ঠিক তখনই একজন বৃদ্ধ আমার কাছে এসে বললেন, “বাবা, ভয় পেও না। তোমার নাম কী?” কাঁপা গলায় নিজের নাম বললাম। তিনি আমাকে কাছে বসালেন, একটা মিষ্টি দিলেন আর বললেন, “বৈশাখ মানে শুধু আনন্দ না, এটা মানুষে মানুষে সম্পর্কেরও উৎসব।”
কিছুক্ষণ পর মাইকিং শুরু হলো—“একটি ছেলে হারিয়ে গেছে…” বুঝলাম তারা আমাকে খুঁজছে। বৃদ্ধ আমাকে নিয়ে ঘোষণার স্থানে গেলেন। সেখানে গিয়ে দেখি বাবা দৌড়ে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরলেন। তার চোখে পানি, কিন্তু মুখে হাসি।
বাড়ি ফেরার পথে বাবা বললেন, “আজ তুমি শুধু উৎসব না, মানুষের ভালোবাসাও দেখলে।” সত্যিই, সেদিন আমি বুঝেছিলাম পহেলা বৈশাখ শুধু নতুন বছর নয়—এটা মানুষের হৃদয়ের নতুন দরজা খোলার দিন।
সেই দিনের স্মৃতি এখনও আমার মনে রঙিন হয়ে আছে। যখনই বৈশাখ আসে, আমি সেই হারিয়ে যাওয়া আর ফিরে পাওয়ার মুহূর্তটা মনে করি। মনে হয়, জীবনও ঠিক বৈশাখের মতো—কিছু হারায়, কিছু খুঁজে পায়, আর শেষে নতুন করে শুরু হয়।
Comments (0)
Login to leave a comment.