"রঙিন দিনের গোপন গল্প"
পহেলা বৈশাখের সকালটা অন্যসব দিনের মতো ছিল না। আকাশে লালচে সূর্য উঠতেই গ্রামের পথগুলো যেন হঠাৎ জীবন্ত হয়ে উঠল। ঢোলের শব্দ, বাঁশির সুর, আর মানুষের আনন্দে ভরা কোলাহল—সব মিলিয়ে এক অদ্ভুত জাদুকরী পরিবেশ।
রাব্বি প্রথমবারের মতো মঙ্গল শোভাযাত্রায় অংশ নিতে যাচ্ছে। ছোটবেলা থেকে সে এই শোভাযাত্রার গল্প শুনে এসেছে—বড় বড় মুখোশ, রঙিন পাখি, বাঘ-সিংহের প্রতীক—সবকিছু যেন জীবন্ত হয়ে ওঠে এই দিনে। কিন্তু আজ সে শুধু দর্শক নয়, সে নিজেই একজন অংশগ্রহণকারী।
শোভাযাত্রা শুরু হতেই রাব্বির চোখে পড়ল এক অদ্ভুত মুখোশ—একটি বিশাল রঙিন পাখি, যার চোখে যেন রহস্য লুকিয়ে আছে। কৌতূহল তাকে টানতে লাগল। সে ধীরে ধীরে ভিড়ের মাঝখানে এগিয়ে গেল। হঠাৎ সে অনুভব করল, মুখোশটি যেন তাকে দেখছে!
এক মুহূর্তের জন্য সময় থেমে গেল। তারপর সবকিছু স্বাভাবিক হয়ে গেল। রাব্বি ভাবল, হয়তো তার কল্পনা। কিন্তু তার মনে একটা প্রশ্ন থেকে গেল—এই উৎসব কি শুধু আনন্দের, নাকি এর ভেতরে আরও কিছু লুকিয়ে আছে?
শোভাযাত্রা শেষে সবাই মিলে বসলো পান্তা-ইলিশ খেতে। ঠান্ডা পান্তা ভাত, ঝাল কাঁচা মরিচ আর সোনালি ভাজা ইলিশ—স্বাদের এক অপূর্ব মেলবন্ধন। রাব্বির মনে হলো, এই খাবারের মধ্যেও যেন বাংলার ইতিহাস আর ঐতিহ্য লুকিয়ে আছে।
দুপুর গড়াতেই শুরু হলো মেলা। রঙিন দোকান, খেলনা, মিষ্টির গন্ধ, নাগরদোলা—সব মিলিয়ে যেন এক স্বপ্নের রাজ্য। রাব্বি একটি ছোট বাঁশির দোকানের সামনে থামল। দোকানদার হাসিমুখে বললেন, “এই বাঁশিটা বাজালে তুমি তোমার নিজের গল্প শুনতে পাবে।”
রাব্বি অবাক হলেও বাঁশিটা কিনে নিল। সে এক কোণে গিয়ে বাজাতে শুরু করল। ধীরে ধীরে তার সামনে ভেসে উঠতে লাগল দিনের সব দৃশ্য—শোভাযাত্রা, মুখোশ, পান্তা-ইলিশ, মেলা—কিন্তু এবার সে বুঝতে পারল, এগুলো শুধু দৃশ্য নয়, এগুলো তার নিজের জীবনের অংশ।
হঠাৎ সে উপলব্ধি করল—মঙ্গল শোভাযাত্রা শুধু উৎসব নয়, এটা অশুভকে দূরে সরিয়ে নতুনকে বরণ করার প্রতীক। পান্তা-ইলিশ শুধু খাবার নয়, এটা আমাদের শিকড়ের সাথে সংযোগ। আর মেলা? এটা আমাদের আনন্দ, স্বপ্ন আর আশা।
সন্ধ্যার আলো নামতেই রাব্বি আকাশের দিকে তাকাল। তার মনে হলো, আজ সে শুধু একটি দিন কাটায়নি—সে একটি গল্পের ভেতর দিয়ে হেঁটে এসেছে।
আর সেই গল্পের নাম—বাংলার প্রাণ, বৈশাখের টান।
Comments (0)
Login to leave a comment.