১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ
Code: COMP-S8ZWNS
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ
আজ ২৬শে মার্চ, মহান স্বাধীনতা দিবস। ভোরের আকাশে কেবল লাল সূর্যটা উঁকি দিতে শুরু করেছে। চারদিকে দেশাত্মবোধক গানের সুর ভেসে আসছে। আটাত্তর বছর বয়সী রহমান সাহেব আজ খুব ভোরে উঠেছেন। বয়সের ভারে শরীর কিছুটা নুয়ে পড়লেও, চোখের দৃষ্টি আজও তীক্ষ্ণ। তিনি তার ঘরের পুরনো কাঠের ট্রাঙ্কটা খুললেন। অনেক যত্নে রাখা একটা ভাঁজ করা লাল-সবুজ পতাকা বের করে আনলেন। পতাকার এক কোণে কালচে হয়ে যাওয়া পুরনো রক্তের দাগ।
রহমান সাহেবের দশ বছর বয়সী নাতি অয়ন ঘরে ঢুকে দাদুকে চুপচাপ বসে থাকতে দেখল। দাদুর চোখে জল। অয়ন কাছে গিয়ে ছোট ছোট হাতে দাদুর গলা জড়িয়ে ধরে জিজ্ঞেস করল, "দাদু, আজ তো আনন্দের দিন, স্বাধীনতা দিবস। তুমি কাঁদছো কেন? আর এই পতাকাটাতে কিসের দাগ?"
রহমান সাহেব নাতিকে বুকে টেনে নিলেন। দীর্ঘশ্বাস ফেলে কাঁপা কাঁপা গলায় বললেন, "দাদুভাই, আজ আনন্দের দিন ঠিকই, কিন্তু এই আনন্দ এমনি এমনি আসেনি। এই রক্তের দাগ শুধু একটা কাপড়ের দাগ নয়, এটা একটা দেশের জন্মের গল্প। আমার আর আমার ভাইদের বুকের রক্তের গল্প। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের গল্প।"
অয়ন দাদুর কোলের কাছে বসলো। রহমান সাহেব স্মৃতিতে ফিরে গেলেন ৫৩ বছর আগের সেই উত্তাল দিনগুলোতে।
"১৯৭১ সালের মার্চ মাস। আমি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, তরতাজা এক যুবক। আমার প্রাণের বন্ধু ছিল শফিক। আমরা সারাদিন একসাথে থাকতাম, দেশের কথা ভাবতাম। ৭ই মার্চ বঙ্গবন্ধুর ভাষণ শোনার পর থেকেই আমাদের রক্ত টগবগ করে ফুটছিল। কিন্তু আমরা কল্পনাও করতে পারিনি ২৫শে মার্চের রাতটা কতটা ভয়াবহ হতে পারে।"
একটু থামলেন রহমান সাহেব। চোখ দুটো তার লাল হয়ে উঠেছে। তিনি আবার বলতে শুরু করলেন, "২৫শে মার্চ, কালরাত্রি। আমরা যখন ঘুমে আচ্ছন্ন, তখন পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী হায়েনার মতো ঝাঁপিয়ে পড়ল ঘুমন্ত বাঙালিদের ওপর। শুরু হলো নির্মম হত্যাযজ্ঞ। বুলেটের তীক্ষ্ণ শব্দ আর মানুষের আর্তনাদে ঢাকার আকাশ ভারী হয়ে উঠল। চোখের সামনে দেখলাম আমার হলের বন্ধুদের গুলি করে মারা হলো। চারদিকে শুধু আগুন আর বারুদের গন্ধ। সেদিন রাতেই আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম—হয় দেশ স্বাধীন করব, নয়তো হাসিমুখে প্রাণ দেব।"
"২৬শে মার্চ ভোরে স্বাধীনতার ঘোষণা শোনার পর মৃত্যুভয় আমাদের কাছে তুচ্ছ হয়ে গেল। আমি আর শফিক গ্রামে ফিরে গেলাম। মায়ের পায়ে হাত দিয়ে বিদায় নেওয়ার সময় মা কাঁদেননি। শুধু বলেছিলেন, 'দেশ স্বাধীন করে তবেই ফিরবি, তার আগে তোর মুখ আমি দেখতে চাই না।'"
অয়ন অবাক হয়ে শুনছে। তার চোখে পলক পড়ছে না।
রহমান সাহেব বলে চললেন, "শুরু হলো মুক্তিযুদ্ধ। আমরা ভারতে গিয়ে ট্রেনিং নিলাম। তারপর ফিরে এলাম রণাঙ্গনে। কখনো খেয়ে, কখনো না খেয়ে, কাদাপানিতে দিনের পর দিন যুদ্ধ করেছি আমরা। মৃত্যুর সাথে তখন আমাদের রোজকার বসবাস। কিন্তু আমাদের ভেতরে একটাই জেদ—স্বাধীন বাংলা।
নভেম্বরের শেষের দিকের কথা। কনকনে শীতের রাত। আমরা একটা পাকিস্তানি ক্যাম্পে অ্যামবুশ (আকস্মিক আক্রমণ) করার প্রস্তুতি নিচ্ছি। প্রচণ্ড গোলাগুলি শুরু হলো। শফিক ছিল আমার ঠিক পাশেই। আমরা যখন শত্রুর বাঙ্কার লক্ষ্য করে এগোচ্ছি, হঠাৎ একটা বিকট শব্দ হলো। দেখলাম শফিক মাটিতে লুটিয়ে পড়েছে। ওর বুকে গুলি লেগেছে।"
রহমান সাহেবের গলা ধরে এলো। তিনি চোখ মুছে বললেন, "আমি হামাগুড়ি দিয়ে শফিকের কাছে গেলাম। ওর বুক থেকে গলগল করে রক্ত বের হচ্ছে। আমি নিজের শার্ট খুলে ওর রক্ত বন্ধ করার চেষ্টা করলাম। কিন্তু শফিক হাসল। ওর পকেট থেকে এই লাল-সবুজ পতাকাটা বের করে আমার হাতে দিল। ওর শেষ কথাগুলো আজও আমার কানে বাজে... 'রহমান, আমি তো দেশের স্বাধীন বাতাস নিতে পারলাম না। তুই এই পতাকাটা স্বাধীন বাংলার আকাশে উড়াস। আমার মাকে বলিস, তার ছেলে বীরের মতো মরেছে, পিঠ দেখিয়ে পালায়নি।'"
দাদুর কথা শুনে ছোট্ট অয়নের দুচোখ বেয়েও জল গড়িয়ে পড়ছে।
"শফিক আমার কোলেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করল। ওর বুকের রক্তে ভিজে গেল পতাকার এই পাশটা। সেদিন আমরা ক্যাম্প দখল করেছিলাম ঠিকই, কিন্তু আমার বুকের ভেতরটা সেদিনই মরে গিয়েছিল। এরপর ১৬ই ডিসেম্বর আমরা যখন বিজয় অর্জন করলাম, চারদিকে যখন বিজয়ের উল্লাস, আমি তখন এই রক্তমাখা পতাকাটা বুকে জড়িয়ে ডুকরে কেঁদেছিলাম। আমি স্বাধীন দেশে ফিরেছিলাম, কিন্তু আমার শফিক আর ফেরেনি। লাখো শফিক, লাখো মা-বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে আমরা পেয়েছি এই স্বাধীনতা।"
রহমান সাহেব থামলেন। ঘরের ভেতর পিনপতন নীরবতা। অয়ন বুঝতে পারল, স্বাধীনতা মানে শুধু স্কুলে গিয়ে গান গাওয়া বা ছুটির দিন কাটানো নয়। স্বাধীনতা মানে লাখো শহীদের রক্ত, অনেক মায়ের শূন্য কোল আর শফিক দাদুদের মতো বীরদের নিঃস্বার্থ আত্মত্যাগ।
অয়ন ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। তারপর দাদুর হাত থেকে সেই রক্তমাখা পতাকাটা পরম শ্রদ্ধায় ছুঁয়ে দেখল। ছোট্ট হাতটা কপালে ঠেকিয়ে সে পতাকাকে স্যালুট করল। ভেজা গলায় দৃঢ় স্বরে বলল, "দাদু, আমি কথা দিচ্ছি, শফিক দাদুর আর তোমাদের এই রক্তের সম্মান আমি কোনোদিন নষ্ট হতে দেব না। আমি এই দেশকে অনেক ভালোবাসব।"
রহমান সাহেব পরম মমতায় নাতিকে জড়িয়ে ধরলেন। ভোরের সোনালি রোদ তখন জানালা দিয়ে সেই পুরনো, রক্তমাখা পতাকার ওপর এসে পড়েছে। রহমান সাহেবের মনে হলো, একাত্তরের শহীদরা যেন আকাশ থেকে হাসছেন। তাদের আত্মত্যাগ বৃথা যায়নি, নতুন প্রজন্ম এই স্বাধীনতার মর্যাদা রক্ষা করবে—এই বিশ্বাসে একজন বয়স্ক মুক্তিযোদ্ধার বুকটা আজ গর্বে ভরে উঠল।
Comments (0)
Login to leave a comment.