স্বাধীনতা একটি অবিনশ্বর শব্দ
অন্ধকার ঘরটার কোণে বসে যখন সুবর্ণা বাইরের একফালি আকাশ দেখত, তার মনে হতো স্বাধীনতা মানে হলো ওই ডানপিটে চড়ুই পাখিটার মতো ডানা ঝাপটানো। সুবর্ণার বয়স যখন কুড়ি, তখন সে জানত না স্বাধীনতা আসলে দেখতে কেমন। তার চারপাশটা ছিল অদৃশ্য শিকলে বাঁধা। সমাজের নিয়ম, পরিবারের মান-সম্মান আর 'লোকে কী বলবে'—এই তিনের যাঁতাকলে তার প্রতিটি ইচ্ছা পিষ্ট হতো।
সুবর্ণার ঠাকুরদা রহমতুল্লাহ সাহেব ছিলেন একজন মুক্তিযোদ্ধা। ছোটবেলায় তাঁর কোলে বসে সুবর্ণা শুনত একাত্তরের গল্প। রহমতুল্লাহ বলতেন, "দাদুভাই, স্বাধীনতা মানে শুধু একটা পতাকা বা একটা মানচিত্র নয়। স্বাধীনতা মানে হলো নিজের মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়ানোর অধিকার। নিজের ভাষায় কথা বলার অধিকার।"
সুবর্ণা প্রশ্ন করত, "দাদু, আমরা তো স্বাধীন দেশে বাস করি, তবে আমার দম বন্ধ লাগে কেন?"
রহমতুল্লাহ দীর্ঘশ্বাস ফেলে জানলার বাইরে তাকাতেন। তিনি উত্তর দিতে পারতেন না যে, দেশ স্বাধীন হলেও মানুষের মন আজও পরাধীনতার বিষে নীল।
গল্পের খাতিরে আমাদের ফিরে যেতে হয় ১৯৭১ সালের সেই রক্তঝরা দিনগুলোতে। রহমতুল্লাহ তখন টগবগে যুবক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। তখন স্বাধীনতা মানে ছিল শোষণের হাত থেকে মুক্তি। পশ্চিম পাকিস্তানের শোষকেরা যখন বাঙালির মুখের ভাষা কেড়ে নিতে চাইল, তখন থেকেই শুরু হয়েছিল প্রতিরোধের আগুন।
রহমতুল্লাহ দেখেছিলেন কীভাবে মিছিলে মিছিলে আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত হতো। "তোমার আমার ঠিকানা, পদ্মা মেঘনা যমুনা।" এই শ্লোগানটি তখন শুধু শব্দ ছিল না, ছিল কোটি বাঙালির অস্তিত্বের গান। সেই সময় স্বাধীনতা ছিল এক সুদূরপ্রসারী স্বপ্ন, যা অর্জনের জন্য লাখে লাখে মানুষ প্রাণ দিতে প্রস্তুত ছিল।
২৫শে মার্চের সেই বিভীষিকাময় রাতে যখন ট্যাংক আর কামানের গর্জন শোনা যাচ্ছিল, রহমতুল্লাহ তখন তাঁর বন্ধুদের নিয়ে গোপন আস্তানায়। তার হাতে তখন কোনো অস্ত্র ছিল না, কিন্তু বুকে ছিল অদম্য সাহস। সেই রাতেই তিনি বুঝেছিলেন, স্বাধীনতা দয়া করে পাওয়া যায় না, একে ছিনিয়ে নিতে হয়। নয় মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর যখন ১৬ই ডিসেম্বর এল, তখন চারদিকে লাশের স্তূপ, স্বজন হারানোর আর্তনাদ। কিন্তু সেই শোকের ওপর দাঁড়িয়ে যখন লাল-সবুজের পতাকাটা প্রথম উড়ল, রহমতুল্লাহর মনে হয়েছিল—এটাই জীবনের শ্রেষ্ঠ দিন।
দেশ স্বাধীন হওয়ার পঞ্চাশ বছর পার হয়ে গেছে। রহমতুল্লাহ এখন বৃদ্ধ। সুবর্ণা তাঁর নাতনি। রহমতুল্লাহ দেখেন, এখনকার স্বাধীনতা যেন শুধু ক্যালেন্ডারের পাতায় লাল রঙে চিহ্নিত একটি দিন। কুচকাওয়াজ হয়, টিভিতে গান বাজে, বড় বড় ভাষণ দেওয়া হয়—কিন্তু প্রকৃত অর্থে কি সাধারণ মানুষ স্বাধীন হতে পেরেছে?
সুবর্ণার ক্ষেত্রে স্বাধীনতা ছিল অন্যরকম। সে গান গাইতে ভালোবাসত। কিন্তু তার বাবা মনে করতেন, "মেয়েদের গান গেয়ে বেড়ানো শোভা পায় না।" সুবর্ণা ছবি আঁকতে চাইত, তাকে জোর করে বিজ্ঞানে ভর্তি করানো হলো। সুবর্ণার কাছে পরাধীনতা ছিল তার নিজের ঘরের ভেতর। সে অনুভব করত, তার চিন্তাচেতনার ওপর অন্য কারোর অধিকার কায়েম করা হচ্ছে।
একদিন সুবর্ণা তার দাদুকে বলল, "দাদু, তোমরা তো যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেছ। কিন্তু আমাকে এই ঘর থেকে কে স্বাধীন করবে? আমার মনের খাঁচা কে ভাঙবে?"
রহমতুল্লাহ সুবর্ণার হাতটা ধরে বললেন, "দাদুভাই, একাত্তরের যুদ্ধ ছিল বাইরের শত্রুর বিরুদ্ধে। আর এখনকার যুদ্ধ হলো নিজের ভেতরের আর সমাজের কুসংস্কারের বিরুদ্ধে। এই যুদ্ধ অনেক বেশি দীর্ঘস্থায়ী এবং কঠিন। এই যুদ্ধে তোমার অস্ত্র হলো তোমার শিক্ষা, তোমার সাহস আর তোমার আত্মবিশ্বাস।"
সুবর্ণা বদলে যেতে শুরু করল। সে বুঝতে পারল, কেউ এসে তাকে স্বাধীনতা উপহার দিয়ে যাবে না। তাকে নিজের পথ নিজে তৈরি করতে হবে। সে গোপনে তার ছবি আঁকা চালিয়ে যেতে লাগল। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিতর্কে সে বারবার বলতে লাগল ব্যক্তিগত স্বাধীনতার কথা।
শহরের এক কোণে তখন এক অন্যরকম অস্থিরতা। একদল তরুণ একজোট হয়েছে দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে। তাদের কাছে স্বাধীনতা মানে হলো ভয়হীনভাবে সত্যি কথা বলা। সুবর্ণা সেই মিছিলে যোগ দিল। প্রথমবার যখন সে রাস্তায় দাঁড়িয়ে চিৎকার করে শ্লোগান দিল, তার মনে হলো বহু বছর ধরে তার গলার কাছে জমে থাকা একটা পাথর সরে গেল। সে অনুভব করল তার ফুসফুস ভরে বিশুদ্ধ বাতাস নিতে পারছে।
পুলিশের লাঠিচার্জ, টিয়ার গ্যাস—কিছুই তাকে দমাতে পারল না। দাদুর রক্ত তো তার ধমনীতেও বইছে। সে দেখল তার পাশে দাঁড়িয়ে আছে অসংখ্য যুবক-যুবতী, যাদের চোখে একই স্বপ্ন—এমন এক দেশ যেখানে মানুষের জাত, ধর্ম বা লিঙ্গ বিচার হবে না। যেখানে স্বাধীনতা মানে হবে সাম্য।
সুবর্ণার বাবা একদিন তার ঘরে ঢুকে দেখলেন সুবর্ণা ব্যাগ গোছাচ্ছে।
"কোথায় যাচ্ছিস?" বাবার গলায় বজ্রগম্ভীর আওয়াজ।
সুবর্ণা শান্ত চোখে তাকাল। "আমি চারুকলায় ভর্তি হওয়ার জন্য পরীক্ষা দিতে যাচ্ছি। আমি আজ থেকে নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নেব।"
বাবা রাগে ফেটে পড়তে যাচ্ছিলেন, কিন্তু সুবর্ণার চোখে এমন এক অদ্ভুত দৃঢ়তা দেখলেন যা তিনি আগে কখনো দেখেননি। তিনি দেখলেন, এই সেই মেয়ে যে একসময় তার সামনে কথা বলতে ভয় পেত, আজ সে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে।
সুবর্ণা বাড়ি থেকে বেরিয়ে এল। রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে তার মনে হলো চারপাশের গাছপালা, মানুষজন—সবই যেন আজ অন্যরকম। সে বুঝল, স্বাধীনতা মানে শুধু একা চলা নয়, স্বাধীনতা মানে হলো অন্যকে স্বাধীন হতে সাহায্য করা।
সে তার দাদুর কাছে ফিরে এল। রহমতুল্লাহ তখন শেষ শয্যায়। সুবর্ণা তাঁর কানে কানে বলল, "দাদু, আমি আমার স্বাধীনতা খুঁজে পেয়েছি। আমি আজ থেকে স্বাধীন।"
রহমতুল্লাহর মুখে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল। তিনি বিড়বিড় করে বললেন, "ব্যক্তি স্বাধীন না হলে দেশ কখনো পূর্ণাঙ্গ স্বাধীন হয় না। তুই সার্থক দাদুভাই।"
গল্পটি এখানেই শেষ হতে পারত, কিন্তু স্বাধীনতা কোনো নির্দিষ্ট বিন্দুতে থেমে থাকে না। এটি একটি প্রবহমান নদীর মতো। রহমতুল্লাহ মারা গেলেন, কিন্তু সুবর্ণার মাধ্যমে তার স্বাধীনতার চেতনা বেঁচে রইল।
আজ সুবর্ণা একজন সফল শিল্পী। তার আঁকা ছবিতে ফুটে ওঠে শেকল ভাঙার গল্প। সে একদল সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের পড়ায়। সেই শিশুদের সে শেখায় শুধু অ আ ক খ নয়, সে শেখায় মানুষের মতো মানুষ হওয়ার গল্প। সে তাদের বোঝায়, স্বাধীনতা মানে হলো অন্যকে সম্মান করা। স্বাধীনতা মানে হলো ঘৃণা থেকে মুক্তি।
সুবর্ণা জানে, প্রতিটা প্রজন্মকে নতুন করে স্বাধীনতার অর্থ খুঁজে নিতে হয়। ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন থেকে একাত্তর, একাত্তর থেকে আজকের গণতান্ত্রিক সংগ্রাম—প্রতিটি ধাপেই স্বাধীনতার সংজ্ঞা বদলেছে। কখনও এটি ছিল ভৌগোলিক মুক্তি, কখনও এটি ছিল অর্থনৈতিক মুক্তি, আর আজ এটি হলো চিন্তার মুক্তি।
স্বাধীনতার সূর্য প্রতিদিন ওঠে, কিন্তু তার আলো সবার কাছে পৌঁছায় না। যতক্ষণ পর্যন্ত একজন মানুষও শোষিত থাকবে, যতক্ষণ পর্যন্ত একটি শিশুও শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত থাকবে, ততক্ষণ পর্যন্ত পূর্ণ স্বাধীনতা অসম্ভব।
সুবর্ণা আজ বিকেলে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে সূর্যাস্ত দেখছিল। সেই চড়ুই পাখিটা আজও উড়ছে। সুবর্ণা মুচকি হাসল। সে এখন জানে, স্বাধীনতার আকাশটা অনেক বড়। সেখানে ওড়ার জন্য কেবল সাহসের পাখা প্রয়োজন। স্বাধীনতা কোনো গন্তব্য নয়, এটি একটি নিরন্তর যাত্রা—নিজের সেরা রূপটি খুঁজে পাওয়ার যাত্রা।
স্বাধীনতা মানে স্বপ্ন দেখার সাহস। স্বাধীনতা মানে সেই স্বপ্নকে সত্যি করার লড়াই। আর সেই লড়াইয়ে যারা কখনো হার মানে না, তারাই পায় প্রকৃত মুক্তির স্বাদ।
Comments (0)
Login to leave a comment.