স্বাধীনতার পেছনের ত্যাগ ও সংগ্রাম
যুদ্ধ শুধু মানচিত্র বদলায় না, বদলে দেয় অসংখ্য মানুষের জীবন। একটি মানুষের ত্যাগ কখনো কখনো একটি পুরো পরিবারের ভবিষ্যৎকে অন্ধকারে ঢেকে দেয়। সেই ত্যাগের গৌরব যেমন আছে, তেমনি আছে গভীর বেদনা, না বলা কান্না আর অপূর্ণ স্বপ্নের দীর্ঘশ্বাস।১৯৭১ সাল। বাংলার আকাশে তখন অশান্তির কালো মেঘ। চারদিকে ভয়, অনিশ্চয়তা আর মৃত্যুর ছায়া। কিন্তু সেই অন্ধকারের মধ্যেই জ্বলে উঠেছিল স্বাধীনতার আগুন একটি জাতির বাঁচার লড়াই।রাশেদ ছিল এক সাধারণ পরিবারের অসাধারণ ছেলে। পড়াশোনায় ভালো, স্বপ্ন ছিল বড় ডাক্তার হওয়ার। বাবা ছিলেন একজন ছোট ব্যবসায়ী, মা গৃহিণী। সংসারে অভাব ছিল, কিন্তু ভালোবাসার কমতি ছিল না। রাশেদ ছিল পরিবারের সবচেয়ে বড় ভরসা তার দিকে তাকিয়েই ছিল বাবা মায়ের সব স্বপ্ন।কিন্তু হঠাৎ করেই সবকিছু বদলে গেল। চারদিকে যুদ্ধের ডাক, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর আহ্বান। রাশেদের মনেও শুরু হলো এক অদৃশ্য যুদ্ধ সে কি নিজের স্বপ্ন বাঁচাবে, নাকি দেশের জন্য সবকিছু ত্যাগ করবে?এক রাতে সে সিদ্ধান্ত নিল। মায়ের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। কাঁপা গলায় বলল,
মা আমি যুদ্ধে যাবো।
মা যেন স্তব্ধ হয়ে গেলেন।
তুই গেলে আমাদের কী হবে বাবা?
রাশেদ ধীরে বলল,
আমি না গেলে এই দেশটাই থাকবে না মা… তখন আমাদের ভবিষ্যৎও থাকবে না।
মা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন। তারপর চোখের পানি মুছে বললেন,
যা বাবা দেশের জন্য।
সেই মুহূর্তে একজন মা তার ছেলেকে শুধু বিদায় দেননি, নিজের হৃদয়ের একটি অংশ ছেড়ে দিয়েছিলেন।রাশেদ চলে গেল। তার সাথে চলে গেল পরিবারের হাসি, নিশ্চিন্ত জীবন আর উজ্জ্বল ভবিষ্যতের সব স্বপ্ন।যুদ্ধের ময়দানে রাশেদ সাহসিকতার সাথে লড়াই করছিল। অনাহার, কষ্ট, মৃত্যু সবকিছুকে উপেক্ষা করে সে এগিয়ে যাচ্ছিল। তার চোখে ছিল শুধু একটি স্বপ্ন "একটি স্বাধীন দেশ" যেখানে তার পরিবার শান্তিতে বাঁচবে।
কিন্তু নিয়তি ছিল নির্মম।
একটি অভিযানের সময় শত্রুর গুলিতে রাশেদ গুরুতর আহত হয়। তার সাথীরা তাকে বাঁচানোর চেষ্টা করেছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত সে আর ফিরে আসেনি। তার ঠোঁটে শেষ যে শব্দ ছিল
"মা"
এই একটি শব্দেই যেন তার সব ভালোবাসা, সব স্বপ্ন আর সব অপূর্ণ ইচ্ছে জমা ছিল।
সবচেয়ে বড় কষ্টের বিষয় রাশেদের লাশও আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। শুধু একজন সহযোদ্ধা এসে বলেছিল,
"রাশেদ খুব সাহস করে লড়েছে"
এইটুকুই ছিল পরিবারের কাছে শেষ সান্ত্বনা।
রাশেদের মা প্রথমে বিশ্বাসই করতে পারলেন না। তিনি প্রতিদিন দরজার দিকে তাকিয়ে থাকতেন যেন এখনই ছেলে এসে বলবে, “মা, আমি ফিরে এসেছি।তিনি রাশেদের ঘর আগের মতোই গুছিয়ে রাখতেন। বিছানাটা পরিষ্কার করতেন, কাপড়গুলো ভাঁজ করে রাখতেন। মাঝে মাঝে রান্না করে একটি থালা আলাদা করে রাখতেন
"রাশেদ আসলে খাবে"
ঈদের দিনগুলো ছিল সবচেয়ে কষ্টের। চারদিকে আনন্দ, কিন্তু এই বাড়িতে নেমে আসত নীরবতা। আলমারি খুলে রাশেদের নতুন কাপড়টা বের করতেন তার মা, তারপর সেটা বুকে জড়িয়ে ধরে নিঃশব্দে কাঁদতেন।
রাশেদের বাবা ধীরে ধীরে নীরব হয়ে গেলেন। একদিন ছেলের পুরোনো খাতার ভেতর একটি লেখা খুঁজে পেলেন
"আমি বড় হয়ে বাবা-মাকে অনেক সুখ রাখবো"
এই লাইনটা পড়ে তিনি আর নিজেকে সামলাতে পারলেন না। চোখের পানি খাতার পাতাগুলো ভিজিয়ে গেলো।
রাশেদের ছোট বোনটি প্রতিদিন ভাইয়ের বইয়ের সামনে দাঁড়িয়ে থাকত। ধীরে ধীরে বলত,
"ভাইয়া, তুমি তো বলেছিলে আমাকে পড়াবে"
একজন মানুষের ত্যাগ শুধু একটি জীবনকে শেষ করে না, এটি একটি পরিবারের হাসি, স্বপ্ন, আশা সবকিছুকে বদলে দেয়।যুদ্ধ শেষে কেউ কেউ ফিরেছিল, কিন্তু অনেকেই আর ফিরে আসেনি। বিজয়ের আনন্দে দেশ ভেসে গেলেও কিছু ঘর রয়ে গেল নিঃশব্দ, শূন্য আর অপেক্ষায় ডুবে। সময়ের সাথে মানুষ অনেক কিছু ভুলে যায়, কিন্তু ভুলতে পারে না সেই বাবা মায়েরা, যারা প্রতিদিন দরজার দিকে তাকিয়ে থেকেছে হয়তো আজ তাদের সন্তান ফিরে আসবে।দিন যায়, মাস যায়, বছর পেরিয়ে যায় তবুও সেই অপেক্ষার শেষ হয় না। জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তারা বুকের ভেতর একটুকরো আশাকে বাঁচিয়ে রাখে। সন্তানের স্মৃতি আঁকড়ে ধরেই তারা বেঁচে থাকে।পৃথিবীতে অনেক কষ্ট আছে, অনেক দুঃখ আছে, কিন্তু সন্তানের লাশের ভার বহন করার মতো কষ্ট আর কিছু নেই। আর যদি সেই লাশটুকুও না পাওয়া যায়, তাহলে সেই কষ্ট আরও গভীর, আরও অসহনীয় হয়ে ওঠে।
রাশেদের মা শেষ বয়সে অসুস্থ হয়ে পড়লেন। মৃত্যুশয্যায় শুয়েও তিনি শুধু একটাই কথা বলছিলেন
"আমার ছেলেটা কি একবার আসবে না?"
তার সেই অপেক্ষা আর শেষ হয়নি। চোখে অপেক্ষা নিয়েই তিনি পৃথিবী ছেড়ে চলে গেলেন।
একজন সন্তানের জন্য বাবা মায়ের এই অনন্ত অপেক্ষা, এই না ফেরা শূন্যতা এটাই যুদ্ধের সবচেয়ে নির্মম সত্য। এখানে শুধু জীবন হারায় না, হারিয়ে যায় হাজারো স্বপ্ন, হাজারো সম্ভাবনা, আর একেকটি পরিবারের সম্পূর্ণ সুখ।
এই ত্যাগই আমাদের স্বাধীনতার ভিত্তি, আবার এই ত্যাগই আমাদের সবচেয়ে বড় কষ্ট।
...সমাপ্ত...
Comments (0)
Login to leave a comment.