স্বাধীনতার ত্যাগ
গ্রামের নাম রূপপুর। ছোট গ্রাম, কিন্তু শান্ত পরিবেশ। সেই শান্ত গ্রামে যুদ্ধের দাবানল ছড়িয়ে পড়ল ১৯৭১ সালের এপ্রিল মাসে। গ্রামের স্কুলশিক্ষক হারুন সাহেব শান্ত প্রকৃতির মানুষ হলেও, দেশপ্রেম ছিল তাঁর শিরায় শিরায়। তাঁর বড় ছেলে, কলেজের ছাত্র আসিফ, মে মাসের এক ভোরবেলায় বন্ধুদের সাথে সীমান্ত পাড়ি দিল মুক্তিবাহিনীতে যোগ দিতে।
যাওয়ার সময় মা ফাতেমা বেগম আঁচল দিয়ে চোখ মুছে বললেন, "বাবা, সাবধানে থাকিস। আবার আসবি তো?"
আসিফ মাকে জড়িয়ে ধরে বলেছিল, "মা, দেশ স্বাধীন না হওয়া পর্যন্ত আমি ফিরে আসব না। যদি না ফিরি, তবে বুঝবে তোমার ছেলে দেশের মাটির সাথে মিশে গেছে।"
হারুন সাহেব নিজের জমানো টাকা মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্য করতেন, তাঁদের খাবার পৌঁছে দিতেন। কিন্তু স্থানীয় এক রাজাকারের খবরের ভিত্তিতে জুলাই মাসের এক অন্ধকার রাতে পাকিস্তানি বাহিনী তাঁদের বাড়ি ঘিরে ফেলে। আসিফকে না পেয়ে তারা হারুন সাহেবকে ধরে নিয়ে যায় এবং বাড়িটিতে আগুন ধরিয়ে দেয়।
হারুন সাহেব আর ফেরেননি। শোনা গিয়েছিল, তাঁকে নদীর পাড়ে গুলি করে ফেলে দেওয়া হয়েছে। সেই খবর শুনে ফাতেমা বেগম পাথর হয়ে গিয়েছিলেন, কিন্তু ভেঙে পড়েননি। তিনি তাঁর ছোট মেয়েকে নিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ে গিয়েও মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য খাবার তৈরি আর গোপন তথ্য পৌঁছে দেওয়ার কাজ চালিয়ে যান। নিজের স্বামী, ঘরবাড়ি—সব হারিয়েও দেশের স্বাধীনতার জন্য তাঁর ত্যাগ ছিল অবিচল।
অবশেষে ১৬ ডিসেম্বর দেশ স্বাধীন হলো। আসিফ ফিরে এল বিজয়ের হাসি নিয়ে, কিন্তু হারুন সাহেব চিরদিনের জন্য হারিয়ে গেলেন। ফাতেমা বেগম ছেলেকে জড়িয়ে ধরে কাঁদলেন—এই কান্না যেমন আনন্দের, তেমনি স্বামী হারানোর তীব্র বেদনার।
এই স্বাধীন মানচিত্রের প্রতিটি ইঞ্চিতে মিশে আছে হারুন সাহেবের মতো হাজারো মানুষের রক্ত আর ফাতেমা বেগমের মতো মায়েদের নিঃস্বার্থ ত্যাগ।
বিজয় দিবসের পড়ন্ত বিকেলে যখন লাল-সবুজ পতাকাটি পতপত করে উড়ছিল, আসিফ তার মায়ের কাঁধে হাত রেখে আকাশের দিকে তাকাল। ফাতেমা বেগম দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে মনে মনে ভাবলেন—হয়তো আকাশের ওই শুকতারা হয়ে হারুন সাহেব আজও দেখছেন তাঁর প্রিয় স্বাধীন দেশকে। ত্যাগের বিনিময়ে পাওয়া এই স্বাধীনতা আসলে কোনো উপহার নয়, এটি এক বিশাল দায়বদ্ধতা। যে মাটির জন্য তাঁরা সর্বস্ব হারিয়েছেন, সেই মাটির মর্যাদা রক্ষা করাই এখন তাঁদের জীবনের একমাত্র ব্রত। ত্যাগের রক্তে ভেজা এই স্বাধীনতা যেন চিরকাল অম্লান থাকে প্রতিটি বাঙালির হৃদয়ে।
Comments (0)
Login to leave a comment.