৩৬ শে জুলাই আমার চোখে গণঅভ্যুত্থান!!
৩৬ জুলাই: বৈষম্যহীন নতুন বাংলাদেশের সূর্যোদয়
ভূমিকা
বাংলাদেশের ইতিহাস আন্দোলন, সংগ্রাম ও প্রতিরোধের ইতিহাস। ১৯৫২-র ভাষা আন্দোলন, ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান এবং ’৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে যে স্বাধীন দেশের অভ্যুদয় ঘটেছিল, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থান সেই ইতিহাসের সোনালী পাতায় এক অভূতপূর্ব ও বীরত্বপূর্ণ অধ্যায় যুক্ত করেছে। "৩৬ জুলাই" কেবল ক্যালেন্ডারের বাইরের কোনো কৃত্রিম সংখ্যা নয়; এটি স্বৈরাচার, অন্যায় ও দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে আপামর জনতার অদম্য সাহস এবং বিজয়ের এক মহান প্রতীক। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মশাল থেকে সূচিত এই স্ফুলিঙ্গ দ্রুতই কোটি মানুষের দাবানলে রূপ নেয় এবং বাংলাদেশকে এক নতুন ভোরের আলো দেখায়।
আন্দোলন ও দাবানলের পটভূমি
২০২৪ সালের জুন মাসে সরকারি চাকরিতে কোটা পদ্ধতি পুনর্বহালের হাইকোর্টের রায়কে কেন্দ্র করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা রাজপথে নেমে আসে। প্রাথমিক পর্যায়ে আন্দোলনটি ছিল সম্পূর্ণ মেধাভিত্তিক সমাজ গঠন এবং সরকারি চাকুরিতে সমতা ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার দাবিতে একটি অহিংস ও যুক্তিসঙ্গত প্রতিবাদ।
তবে সাধারণ শিক্ষার্থীদের এই ন্যায্য দাবিকে অগ্রাহ্য করে যখন প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক বলপ্রয়োগ করা হয় এবং শান্তিকামী শিক্ষার্থীদের ওপর একের পর এক হামলা চালানো হয়, তখন সারাদেশের মানুষের বুকের ভেতর জমে থাকা ক্ষোভ অগ্নেয়গিরির মতো ফেটে পড়ে। "কোটা সংস্কার আন্দোলন" মুহূর্তের মধ্যেই রূপ নেয় প্রতিটি নাগরিকের অধিকার পুনরুদ্ধারের এক ঐতিহাসিক বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে।
‘৩৬ জুলাই’: একটি প্রতীকী বিপ্লব ও গণআকাঙ্ক্ষা
সাধারণ হিসাব অনুযায়ী জুলাই মাস ৩১ দিনে শেষ হলেও ২০২৪ সালের জুলাইয়ের রক্তঝরা দিনগুলোতে আন্দোলনকারীদের চেতনায় সময় যেন আটকে গিয়েছিল। দীর্ঘদিনের নিপীড়ন, কারফিউ, ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট, কাঁদানে গ্যাস আর বুলেট পেরিয়ে আন্দোলন যখন চূড়ান্ত ধাপে পৌঁছায়, তখন আন্দোলনকারীরা আগস্টের ৪ ও ৫ তারিখের সময়সীমাকে প্রতীকী অর্থে '৩৫ ও ৩৬ জুলাই' হিসেবে অভিহিত করেন।
৫ আগস্ট (অর্থাৎ প্রতীকী ৩৬ জুলাই) ঢাকা অভিমুখে লাখ লাখ জনতার ঐতিহাসিক 'লং মার্চ' ও অভূতপূর্ব ছাত্র-জনতার জোয়ারে স্বৈরাচারী শাসনের পতন ঘটে। তাই '৩৬ জুলাই' কেবল একটি কাল্পনিক তারিখ নয়—এটি ভয়কে জয় করে একটি নিপীড়িত জাতির ঘুরে দাঁড়ানো ও পুনর্জন্মের চিরন্তন স্মারক।
রক্তের অক্ষরে লেখা শহীদী গাথা ও হৃদয়স্পর্শী ত্যাগ
এই অভ্যুত্থানের পথ মসৃণ ছিল না; প্রতি পদে পদে ছিটকে পড়েছে অজস্র বীরের রক্ত। রাজপথে তাজা প্রাণ উৎসর্গ করেছেন শত শত তরুণ ও সাধারণ নাগরিক:
আবু সাঈদ: রংপুর বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের এই অকুতোভয় তরুণ দুই হাত প্রসারিত করে বুক পেতে দাঁড়িয়েছিলেন বুলেটের সামনে। তাঁর সেই অনড় ও নির্ভীক ভঙ্গিমা পুরো বাংলাদেশকে একমুহূর্তে শৃঙ্খল ভাঙার সাহস জুগিয়েছিল।
মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধ: উত্তরায় আন্দোলনরত তৃষ্ণার্ত ভাইদের মাঝে পানির বোতল বিতরণ করতে করতে যিনি বলে গিয়েছিলেন—"পানি লাগবে কারো, পানি?"। কিছুক্ষণের মধ্যেই বুলেটের আঘাতে তাঁর জীবনের স্পন্দন থেমে যায়, কিন্তু তাঁর সেই করুণ ও সহমর্মী কণ্ঠস্বর কোটি মানুষের হৃদয়ে আজীবন হাহাকার হয়ে থাকবে।
ইমাম হাসান তাইম ও অন্যান্যরা: স্কুল-কলেজের কোমলমতি কিশোর থেকে শুরু করে খেটে খাওয়া রিকশাচালক ও শ্রমজীবী মানুষের আত্মত্যাগ এই আন্দোলনকে আমজনতার মহাকাব্যে পরিণত করে।
হাজার হাজার তরুণ চিরতরে দৃষ্টি হারিয়েছেন, পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন শত শত মানুষ। তাদের এই রক্তের বিনিময়েই অর্জিত হয়েছে স্বাধীনতার নতুন রূপ।
সর্বস্তরের একতা ও সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ
জুলাই অভ্যুত্থানের সবচেয়ে সুন্দর ও শক্তিশালী দিকটি ছিল দল-মত, ধর্ম-বর্ণ ও শ্রেণি নির্বিশেষে সর্বস্তরের মানুষের অভূতপূর্ব সংহতি। প্রাইভেট ও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পাশে এসে দাঁড়ান স্কুল-কলেজের কিশোররা, অভিভাবকরা, শিক্ষকমণ্ডলী, চিকিৎসক, আইনজীবী, সাংবাদিক, প্রকৌশলী এবং শ্রমজীবী মানুষ। প্রবাসীরাও আন্তর্জাতিক দরবারে কণ্ঠ মিলিয়েছেন এই রাজপথের বীরদের সাথে।
একই সাথে রাজপথে জন্ম নেয় নতুন এক সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ:
গ্রাফিতি ও দেয়ালচিত্র: শহরের প্রতিটা নিষ্প্রাণ দেয়াল সেজে ওঠে দ্রোহ, প্রতিবাদ ও ভালোবাসার রঙে। "বিকল্প কে? তুমি, আমি, আমরা", "আমাদের বাংলা আমরাই গড়বো"—এমন সব উদ্দীপনামূলক বাক্য দেয়ালে দেয়ালে খোদাই হয়ে যায়।
সঙ্গীত ও গণমাধ্যম: তরুণ র্যাপার ও শিল্পীদের গান, প্রতিবাদী কবিতা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের জোয়ার পুরো বিশ্বকে বাংলাদেশের মানুষের মুক্তির আকুতি জানিয়ে দেয়।
৩৬ জুলাইয়ের অর্জন ও সংস্কারের প্রতিশ্রুতি
৩৬ জুলাইয়ের ঐতিহাসিক বিজয় কেবল কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির বা দলীয় ক্ষমতার পালাবদল ছিল না; এটি ছিল ব্যবস্থার পরিবর্তনের ডাক। এর মূল অর্জনগুলো হলো:
১. ভয়হীন সমাজ গঠন: সাধারণ মানুষের মন থেকে যুগের পর যুগ ধরে চেপে বসা ভয়ের সংস্কৃতি দূর হয়েছে।
২. তরুণ নেতৃত্বের উত্থান: দেশের ভবিষ্যৎ যে তরুণ প্রজন্মের হাতে নিরাপদ এবং তারা যে রাষ্ট্রের সংস্কারের কান্ডারী হতে পারে, তা প্রমাণিত হয়েছে।
৩. ন্যায়বিচার ও রাষ্ট্র সংস্কারের অঙ্গীকার: শাসনব্যবস্থা, বিচারবিভাগ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে নিরপেক্ষতা ও জবাবদিহিতা ফিরিয়ে আনার এক নতুন যাত্রা শুরু হয়েছে।
নতুন ভোর ও ভবিষ্যতের অঙ্গীকার
"জুলাই ২০২৪ শুধু একটা মাস ছিল না—ছিল রক্ত, কান্না আর সাহসিকতায় লেখা একটি জাতির অস্তিত্বের লড়াই।" ৩৬ জুলাই আমাদের এই শিক্ষাই দেয় যে, সত্য, ইনসাফ ও সাম্যের লড়াইয়ে যখন দেশের জনগণ ঐক্যবদ্ধ হয়, তখন কোনো অত্যাচারী শক্তিই তাদের পরাজিত করতে পারে না।
শহীদদের তাজা রক্ত এবং পঙ্গুত্ব বরণ করা হাজারো সেনানীর আত্মত্যাগকে সার্থক করতে হলে আমাদের একটি বৈষম্যহীন, দুর্নীতিমুক্ত, মুক্তচিন্তার ও মানবিক বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হবে। এই বৈষম্যহীন নতুন বাংলাদেশের সূর্যোদয় আগামী দিনের প্রতিটি প্রজন্মকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার প্রেরণা জুগিয়ে যাবে চিরকাল।
Comments (0)
Login to leave a comment.