শৈশবের স্মৃতিতে বৈশাখ
শৈশবের স্মৃতিতে বৈশাখ
বাংলা নববর্ষ কেবল সার্বজনীন উৎসব নয়, বরং এটা বাঙালির প্রাণের মেলবন্ধন ঘটানোর এক চমৎকার আয়োজন। তাই বর্ষবরণের অনুষ্ঠানে সকল শ্রেণীর মানুষের মেলবন্ধন ঘটে। বছরের পর বছর কেটে গেলেও পহেলা বৈশাখ উদযাপনের আবেদন এতোটুকুও কমে যায় নি।আর পহেলা বৈশাখ ঘিরে শৈশবে কাটানো স্মৃতিগুলো কতোই না মধুর!
টেপা পুতুলঃ মাটির তৈরি টেপা পুতুলের নাম অনেকবার শুনেছিলাম। কিন্তু কখনও দেখা হয় নি। দ্বিতীয় শ্রেণীতে পড়াকালীন সময়ে আমি সপরিবারে বৈশাখী মেলায় ঘুরতে যাই। সেখানে অনেক ধরণের মৃৎশিল্পের দেখা মিলে। সেখানে মাটি দিয়ে তৈরি সুন্দর পোড়ামাটির এক ধরণের পুতুল চোখে পড়ে। আম্মুকে বলেছিলাম, " আমি যে টেপা পুতুলের কথা শুনেছিলাম, এটাই কি সেই টেপা পুতুল! "
আম্মু বলেছিলেন, " হুম, এটাই সেই টেপা পুতুল। তোমার পছন্দ হয়েছে? "
আমি বললাম, " হুম, অনেক পছন্দ হয়েছে। "
আমার পছন্দ হয়েছে দেখে আম্মু তিনটা টেপা পুতুল কিনে দিলেন। "
এখন তো পুতুল খেলার বয়স পার করে এসেছি, তবে টেপা পুতুলটা যত্ন করে রেখে দিয়েছি।
পাখির বাঁশিঃ নামটা বিচিত্র এবং সুন্দর। আর এমন যে বাঁশি হতে পারে, জানতামই না। ক্লাস সিক্সে পড়ি সম্ভবত। পরিবারের সাথেই মেলায় ঘুরছিলাম। হঠ্যাৎ শুনি পাখির কিচিরমিচিরের শব্দ। এদিক-সেদিক তাকিয়ে কোনো পাখির দেখা পেলাম না। আবারও পাখির কিচিরমিচির আমার কানে বাজলো। আমি কৌতুহলে চারদিক তাকালাম। আর তখনই আবিষ্কার করলাম যে ,এটা কোনো জীবন্ত পাখির কিচিরমিচিরের শব্দ নয়। বরং এটা কৃত্রিমভাবে বাঁশির মাধ্যমে সুর তৈরি করে পাখির কিচিরমিচিরের সুরের আদলে রূপ দেওয়া হয়েছে। আর বাঁশিটার ডিজাইনেও শৈল্পিক বিষয় আছে। মাটি দিয়ে তৈরি একটা পাখির অবয়ব।আর লেজের দিকে বাঁশির মতো ছিদ্র করা। সেখানে সামান্য পানি দিয়ে ফুঁ দিলেই পাখির কিচিরমিচিরের সমধুর সুর তৈরি হয়। আমার পাখির বাঁশিটা দারুণ পছন্দ হলো। কিনে ফেললাম।
বিজলী চুড়িঃ
মেলায় তখন বিচিত্র জিনিসের দেখা মিলতো। দেখলাম সবাই একটা জিনিস হাতে পড়ছে। চুড়ির মতো দেখতে। যে যেভাবে পড়ে আর কী।তবে এটা যে সে চুড়ি নয়। এই চুড়ির মধ্যে রেডিয়াম আছে।
রাতে এই চুড়ি পড়লে আলো জ্বলে। আর এজন্যই এই চুড়ি কেনার প্রতি মানুষের এতো আকর্ষণ ছিলো। দাম কম থাকার কারণে আমরা তিনটা রেডিয়াম চুড়ি কিনে ফেললাম।
ঝিকিমিকি কাঁচের টিউবঃ
বৈশাখী মেলায় অন্য জিনিসের থেকে এই নান্দনিক জিনিসটা আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করে। আমি যতোবারই মেলায় যাই, ততোবারই এই ঝিকিমিকি কাঁচের টিউব এর খোঁজ করি। আর কয়েক বছর আগেও এই ঝিকিমিকি কাঁচের টিউব মেলা থেকে কিনেছিলাম। বেশ যত্ন করেই রেখেছিলাম। কিন্তু একবার কী একটা বিষয়ে ছোট বোনের সাথে মনোমালিন্য হয়। আর সেই রাগের প্রভাব পড়ে ঝিকিমিকি কাঁচের টিউব এর উপর। আর সেটাই আমার কাঁচের টিউব এর শেষ বিদায়ের মুহূর্ত। এরপর অনেক খুঁজি, কিন্তু পাই নি।
ছোট মামার চমকঃ
একবার সপরিবারে পহেলা বৈশাখের মেলায় ঘুরতে ঘুরতে মাটির তৈরি বাঘের অবয়ব খুব পছন্দ হয়েছিলো। কিন্তু দাম বেশি থাকার কারণে আর কিনতে পারি নি।মামা সেই বিষয়টা খেয়াল করেছলেন ।তাই আমার ৭ম জন্মদিনে কোথা থেকে যেনো একই রকম মাটির তৈরি বাঘের অবয়ব আমাকে উপহার দেন। আমার যে কী আনন্দ হয়েছিলো, তা বলে বুঝানো যাবে না।
আরেকটা উপহার দিয়েছিলেন। সেটাও অনেক সুন্দর। একটা মোটা কাগজ ফানেলের মতো ভাঁজ করা। আর সেটার ভিতরে চারদিকে আয়না দেওয়া। একদম শেষে রঙিন কাগজের টুকরো এমনভাবে রাখা,যেনো সেটা যতোবার ঘুরানো হয়, ততোবারই একেক রকম ফুলের ডিজাইন দেখা যায় বায়োস্কোপ এর মতো।
রঙিন শৈশব হয়তো ফিরে পাবো না। তবে শৈশবের স্মৃতিগুলো থেকে যাবে আজীবন।
সাবরিনা তাহ্সিন
আকুয়া,ময়মনসিংহ
Comments (0)
Login to leave a comment.