স্মৃতিপটে জুলাই বারুদ, বুলেট আর এক টুকরো রোদ
"তুমি কে? আমি কে? বিকল্প! বিকল্প!"
২০২৪-এর সেই তপ্ত জুলাইয়ে ঢাকার রাজপথে দেওয়ালে দেওয়ালে আঁকা এই গ্রাফিতিটা যখনই মনে পড়ে, বুকের ভেতর আজো এক অদ্ভুত শিহরন জেগে ওঠে।
আজ ২০২৬ সালের জুলাই মাস। ক্যালেন্ডারের পাতায় ঠিক দু বছর পার হয়ে গেছে। কিন্তু জানালার বাইরে তাকালে কেন যেন আজো মনে হয় এই বুঝি চারপাশ অন্ধকার হয়ে ইন্টারনেট বন্ধ হয়ে যাবে, এই বুঝি সাইরেন বাজিয়ে ধেয়ে আসবে সাউন্ড গ্রেনেড আর টিয়ারগ্যাসের ঝাঁঝালো ধোঁয়া। ২০২৪-এর সেই জুলাইয়ের দিনগুলো কোনো সাধারণ দিন ছিল না; ওটা ছিল একাধারে নরক আর স্বর্গের সহাবস্থান। একদিকে ছিল মরনপণ ভয়, অন্যদিকে ছিল বুক চিতিয়ে দাঁড়ানোর এক অলৌকিক সাহস।
১৬ই জুলাইয়ের পর থেকে পুরো দৃশ্যপট বদলে গিয়েছিল। রংপুরে ভাই আবু সাঈদের সেই দুই হাত প্রসারিত করে বুক পেতে দেওয়ার দৃশ্য দেখার পর, আমাদের জেনারেশনের সবার ভেতরের ভয়টা এক নিমেষে কর্পূরের মতো উড়ে গিয়েছিল। আমার মনে আছে, মিরপুরের গলিতে যখন সাউন্ড গ্রেনেড ফাটছিল, তখন আমরা কয়েকজন বন্ধু মিলে সাউন্ড গ্রেনেডের আওয়াজকে ছাপিয়ে স্লোগান দিচ্ছিলাম। আমাদের হাতে কোনো অস্ত্র ছিল না, শুধু ছিল ন্যায়ের জেদ আর গলার রগ ফুলিয়ে দেওয়া চিৎকার।
সবচেয়ে বেশি মনে পড়ে সেই গা ছমছমে 'ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট'-এর রাতগুলোর কথা। পুরো দেশ বাকি পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন। চারদিকে শুধু গুজব আর আতঙ্ক কার বাসায় রেইড হলো, কাকে তুলে নিয়ে যাওয়া হলো। আমরা পাড়ার ছেলেরা মিলে রাত জেগে লাঠি হাতে গলি পাহারা দিতাম। ছাদে দাঁড়িয়ে দেখতাম দূরের আকাশে আলোর ঝলকানি ওটা কোনো আতশবাজি ছিল না, ওটা ছিল বারুদের আগুন। প্রতিটি সকাল আসত এক বুক অজানা আতঙ্ক নিয়ে, ফেসবুকে বা পরিচিতদের মেসেজে কার প্রোফাইল পিকচার কালো হয়ে গেছে, সেই ভয়ে ফোন হাতে নিতে হাত কাঁপত।
কিন্তু সেই বিভীষিকার মধ্যেও জুলাই আমাকে মানুষ চিনিয়েছে, বাঙালি চিনিয়েছে। রামপুরার এক দুপুরে যখন আমরা টিয়ারগ্যাসের ধোঁয়ায় চোখ খুলতে পারছিলাম না, তখন এক অপরিচিত মা ও বোন ছাদ থেকে বালতি বালতি পানি আর টুথপেস্ট নিচে ছুড়ে দিচ্ছিলেন। এক রিকশাচালক মামা নিজের রিকশায় প্লাস্টিকের বস্তা বিছিয়ে রক্তাক্ত এক ছোট ভাইকে তুলে নিয়ে হাসপাতালের দিকে ছুটছিলেন, উনার নিজের পায়ে তখনো স্প্লিন্টারের আঘাত। আমি যখন উনাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, "মামা, আপনার ভয় করছে না?" উনি রিকশার পেডালে চাপ দিতে দিতে বলেছিলেন, "মরলে একবারই মরুম মামা, কিন্তু পোলাপানগুলারে মরতে দিমু না।"
মীর মুগ্ধর সেই শেষ কথা কটি "পানি লাগবে কারো, পানি?" আজো মাঝরাতে আমার কানে প্রতিধ্বনিত হয়। ওই একটা বাক্য শুধু তৃষ্ণা মেটানোর ডাক ছিল না, ওটা ছিল বিপদে একে অপরের পাশে দাঁড়ানোর এক চিরন্তন মন্ত্র।
আজ ২০২৬ সালে এসে যখন শান্ত, মুক্ত বাতাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে বা রাজপথে হাঁটি, তখন পায়ের নিচের মাটির দিকে তাকালে মনে হয় এই মাটির কোনো না কোনো কোণায় আমার কোনো এক সহযোদ্ধার রক্ত মিশে আছে। মেট্রোরেলের পিলারে আঁকা মলিন হয়ে আসা গ্রাফিতিগুলোর দিকে তাকালে এখনো চোখে জল আসে। জুলাই আমাদের যেমন কাঁদিয়েছে, তেমনই আমাদের মেরুদণ্ড সোজা করে বাঁচতে শিখিয়েছে।
জুলাইয়ের সেই রক্তভেজা স্মৃতিগুলো আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ এবং সবচেয়ে পবিত্র আমানত, যা আমি আমৃত্যু বুকে বয়ে বেড়াব।
Comments (0)
Login to leave a comment.