স্মৃতির আবির: ২০২০-এর বৈশাখ
শহরের কংক্রিটের জঙ্গল-এ, পহেলা বৈশাখ সাধারণত একটি যান্ত্রিক উদযাপনই ছিল—লাল-সাদা পাঞ্জাবিতে রামনার ভিড় ঠেলে যাওয়া বা কোনো ফ্যান্সি রেস্তোরাঁয় অতিরিক্ত দামের পান্তা-ইলিশ খাওয়া। তবে, ২০২০ সালের এই নতুন প্রভাতে, অর্ণব নিজেকে পাবনার এক ছোট্ট গ্রামে, তার শিকড়ের কাছে ফিরে পেয়েছিল। দশটি দীর্ঘ বছর পর, সে ফিরে এসেছিল, গ্রামের মেলার আকর্ষণ আর দাদীর হাতে তৈরি মিষ্টি-নাশতার গন্ধে টানা।
প্রভাত ও মঙ্গল শোভাযাত্রা
গ্রামের সকাল শুরু হল পাখিদের কিচকিচানি আর লোকসঙ্গীতের সুর দিয়ে। অরণব দেখল, স্থানীয় স্কুল মাঠ থেকে একটি প্রাণবন্ত মঙ্গল শোভাযাত্রা (উৎসবের মিছিল) বেরিয়ে আসছে। এতে শহরের মতো বিশাল কোনো কাঠামো ছিল না, কিন্তু বাঁশ ও রঙিন কাগজে তৈরি চিল-পাখি, বাঘের মুখোশ আর হাতে আঁকা মাটির হাঁড়িগুলো যেন প্রাণবন্ত এক স্পর্শে জীবন্ত হয়ে উঠেছিল। যখন ছোট ছোট বাচ্চারা কপালে ঐতিহ্যবাহী চিহ্ন এঁকে "এসো হে বৈশাখ" গান গাইতে গাইতে মাটির পথে হেঁটে যাচ্ছিল, তখন অরণব বুঝতে পারল যে আনন্দ বিলাসিতায় নয়, বরং জীবনের গভীরেই নিহিত।
পান্তা-ইলিশ এবং চিরন্তন বিকেল
বাড়ি ফিরে এলে, দাদীর জাদুর সময় হয়ে গেল। মাটির বাটিতে পরিবেশিত ভিজে ভাত (পাণ্টা ভাত), সাথে ছিল সবুজ মরিচ, পোড়া বেগুন বাটা (বেগুন ভর্তা) এবং মুচমুচে ভাজা ইলিশ মাছ। বারান্দায় খড়ের চটাইয়ের ওপর বসে, সেই খাবারের তৃপ্তি তার সমস্ত শহুরে ক্লান্তি দূর করে দিল। তার দাদি বললেন: বৈশাখ আসে ঝাঁঝালো গরমে, কালবৈশাখী ঝড়ের আগমনবার্তা দিতে; মনে রেখো নাতি, পুরনো আর ক্লান্ত সব মুছে না গেলে নতুন জীবন ফুটতে পারে না।"
গ্রামের মেলা: কল্পনা বনাম বাস্তবতা
দুপুরের পর, অরণব স্থানীয় মেলায় গেল। বাতাসে ভেসে আসছিল কাঠের Ferris চাকার ঘসঘসে আওয়াজ আর বাতাসা ও কদমার মতো চিনি-মাখা মিষ্টির মিষ্টি সুবাস। দূর থেকে বাঁশের বাঁশির সুর তাকে তার শৈশবের কথা মনে করিয়ে দিল, যখন সে সারাবছর পয়সা জমিয়ে একটা মাটির ব্যাংক কিনত। এখন হয়তো মানুষের হাতে স্মার্টফোন, কিন্তু মাটির পুতুল আর কাঠের ঘোড়ার সেই আদিম আকর্ষণ একটুও ফিকে হয়নি।
হঠাৎ, আকাশের এক কোণে কালবৈশাখীর (গ্রীষ্মকালীন ঝড়) কালো মেঘ জমে উঠল। ঝোড়ো হাওয়া বইতে শুরু করে, ধুলো উড়িয়ে দিতে দিতে, অরণব বুঝতে পারল—এটাই প্রকৃত বৈশাখ। এমন এক শক্তি যা সবকিছু ভেঙে ফেলে, শুধুমাত্র পুনর্নির্মাণের বার্তা দিতে। তার কাছে, বৈশাখ ২০২০ শুধু ক্যালেন্ডারের পাতা বদলানো ছিল না; এটি ছিল নিজের আত্মাকে পুনরায় আবিষ্কার করার এক উৎসব।
Comments (0)
Login to leave a comment.