**“স্মৃতির পাতায় ফিরে দেখা এক চিরন্তন বৈশাখ”**
সকালের আলোটা সেদিন অন্যরকম ছিল। মনে হচ্ছিল, সূর্যটা যেন একটু বেশিই উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে—শুধু আমার জন্য। আমি তখন ক্লাস সিক্সে পড়ি। পহেলা বৈশাখ মানেই নতুন জামা, মেলা, আর এক অদ্ভুত আনন্দ—যেটা ভাষায় বোঝানো যায় না, শুধু অনুভব করা যায়।
সেদিন ভোরেই মা আমাকে ডাকলেন,
— “তাশফিক, ওঠ! আজ কিন্তু দেরি করলে চলবে না!”
চোখ মেলে দেখি, লাল-সাদা পাঞ্জাবিটা আমার বিছানার পাশে গুছিয়ে রাখা। মনে হলো, যেন সেটাও আমার মতোই অপেক্ষা করছিল এই দিনের জন্য। তাড়াতাড়ি উঠে গোসল সেরে জামাটা পরে নিলাম। আয়নায় নিজেকে দেখে মনে হলো, আমি যেন নতুন একটা মানুষ হয়ে গেছি।
বাড়ির বাইরে বের হতেই শুনলাম ঢাকের শব্দ। দূর থেকে ভেসে আসছে—
“এসো হে বৈশাখ…”
গানটা যেন বাতাসে মিশে পুরো গ্রামটাকে জাগিয়ে তুলেছে।
আমরা সবাই মিলে গেলাম মেলায়। চারদিকে রঙের উৎসব—কেউ লাল, কেউ সাদা, কেউবা রঙিন পাঞ্জাবি আর শাড়িতে সাজানো। ছোট ছোট দোকানে পান্তা-ইলিশ, পিঠা, নানান খেলনা। আমি বাবার হাত ধরে হাঁটছিলাম, কিন্তু চোখ ছিল সবদিকে—কোথাও যেন কিছু মিস না হয়ে যায়।
হঠাৎ একটা জায়গায় থেমে গেলাম। একজন বয়স্ক মানুষ বাঁশি বাজাচ্ছিলেন। তার সুরে একটা অদ্ভুত টান ছিল। আমি দাঁড়িয়ে শুনতে লাগলাম। বাবা বললেন,
— “দেখো, এই সুরটাই আমাদের সংস্কৃতি। এই সুরেই লুকিয়ে আছে বৈশাখের আসল আনন্দ।”
তার কথা শুনে মনে হলো, আজকের দিনটা শুধু আনন্দের না—এটা আমাদের পরিচয়, আমাদের শিকড়।
মেলার শেষে আমরা নদীর ধারে গেলাম। হালকা বাতাস বইছিল। আমি চুপচাপ বসে ছিলাম। হঠাৎ মনে হলো, এই দিনটা যেন কখনো শেষ না হয়।
কিন্তু সময় তো থেমে থাকে না। সূর্য ধীরে ধীরে পশ্চিমে ঢলে পড়ল। বাড়ি ফেরার পথে আমি বারবার পেছনে তাকাচ্ছিলাম—মেলা, মানুষ, রঙিন দিনটা যেন একটু একটু করে দূরে সরে যাচ্ছে।
সেই দিনটার পর অনেক বৈশাখ এসেছে, গেছে। এখন আমি বড় হয়েছি, ব্যস্ততায় অনেক কিছুই বদলে গেছে। কিন্তু সেই ছোটবেলার পহেলা বৈশাখ—মায়ের ডাক, নতুন জামার গন্ধ, ঢাকের শব্দ, আর সেই বাঁশির সুর—সবকিছু আজও ঠিক আগের মতোই মনে আছে।
কারণ, কিছু স্মৃতি সময়ের সাথে মুছে যায় না।
বরং প্রতি বৈশাখে নতুন করে ফিরে আসে—
হৃদয়ের গভীর থেকে। 🌼
Comments (0)
Login to leave a comment.