স্থগিত পরীক্ষা এবং ৩৬ জুলাই
২০২৪ সালের জুলাই মাসের কথা। আমি তখন চট্টগ্রামের একটা কলেজে একাদশ শ্রেণিতে পড়ি। মাথায় তখন শুধু একটাই ভূত চাপানো সামনে বার্ষিক ফাইনাল পরীক্ষা যেকোনো মূল্যে ভালো রেজাল্ট করতে হবে। টেবিলজুড়ে বই-খাতা ছড়িয়ে দিনরাত এক করে পড়ছিলাম। কিন্তু ঘরের ভেতরের এই পড়ার পরিবেশটা বাইরের পরিস্থিতির কারণে খুব দ্রুত ওলটপালট হয়ে যেতে শুরু করল।
ঢাকায় কোটা সংস্কার আন্দোলন তখন বেশ তুঙ্গে। টিভির খবরে রোজই দেখতাম কী হচ্ছে না হচ্ছে। দেখতে দেখতে আমাদের শান্ত চট্টগ্রাম শহরটাও হঠাৎ কেমন যেন গরম হয়ে উঠল। চকবাজার বহদ্দারহাট আর জিইসি মোড়ের দিকে প্রতিদিন মিছিল-মিটিং হচ্ছিল। ঘরের ভেতর বসেও সেই স্লোগানের আওয়াজ স্পষ্ট পাওয়া যেত। একদিন সকালবেলা পরীক্ষার শেষ মুহূর্তের রিভিশন দিচ্ছি এমন সময় কলেজ থেকে নোটিশ এলো পরিস্থিতির কারণে পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে। বাইরের টিপটিপ বৃষ্টির সাথে মিলিয়ে মনের ভেতরও তখন এক অদ্ভুত বিষণ্ণতা নেমে এলো। প্রথম ভেবেছিলাম হয়তো দুই-চার দিনের ব্যাপার পরিস্থিতি শান্ত হলেই আবার নতুন রুটিন দেবে। কিন্তু ভুল ভাঙতে বেশি সময় লাগল না আমাদের ঘরের জানালার ফাঁক দিয়ে প্রায়ই কাঁদানে গ্যাসের ঝাঁজালো গন্ধ আসত। মাঝে মাঝে দূর থেকে ভেসে আসা গুলির শব্দে বুকটা ধড়ফড় করে উঠত। পরিস্থিতি এতটাই খারাপ ছিল যে আম্মু-আব্বু আমাকে কোনোভাবেই ঘরের বাইরে পা রাখতে দিত না। এর মধ্যে একদিন হঠাৎ ইন্টারনেট পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেল। বাইরের দুনিয়া থেকে আমরা একরকম বিচ্ছিন্নই হয়ে গেলাম। বন্ধুদের সাথে যোগাযোগের কোনো উপায় ছিল না খবরের জন্য একমাত্র ভরসা ছিল টেলিভিশন। টিভির পর্দায় যখন দেখতাম আমারই বয়সী ছেলেরা বুকে বুলেট নিয়ে রাস্তায় লুটিয়ে পড়ছে তখন ঘরের ভেতর নিরাপদে বসে থাকাটা এক ধরণের অপরাধ মনে হতো। বইয়ের পাতায় আর কোনোভাবেই মন বসত না। স্থগিত হওয়া পরীক্ষার চেয়ে দেশের ভবিষ্যৎ নিয়েই বেশি চিন্তা হতো।
অবশেষে এলো সেই বহুল প্রতীক্ষিত ৩৬ জুলাই। দুপুরের পর যখন টিভির পর্দায় খবরটা শুনলাম প্রথমটায় বিশ্বাসই হচ্ছিল না আম্মু-আব্বুসহ আমরা সবাই বোকার মতো বসে রইলাম একটু পরেই বাইরে মানুষের চিৎকার আনন্দ আর করতালির শব্দ কানে এলো। জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখি চট্টগ্রামের রাস্তায় রাস্তায় মানুষের ঢল নেমেছে, যে যার মতো খুশিতে আত্মহারা হয়ে ছুটছে। অপরিচিত মানুষও একে অপরকে মিষ্টি খাওয়াচ্ছে। পরীক্ষা স্থগিত হওয়া নিয়ে মনের কোণে যে সামান্য দুশ্চিন্তা লুকিয়ে ছিল তা এক সেকেন্ডে উধাও হয়ে গেল। মনে হলো পরীক্ষা তো জীবনে সামনে আরও কত দেওয়া যাবে কিন্তু চোখের সামনে এমন ইতিহাস তৈরি হতে দেখার সুযোগ কি আর বারবার আসে? একটা বৈষম্যহীন নতুন দেশের শুরুর সাক্ষী হয়ে থাকতে পারার আনন্দটায় অন্যরকম।
Comments (0)
Login to leave a comment.