পর্ব–১: শশী লজে যাওয়ার পরিকল্পনা
পরীক্ষা শেষ হতেই তিন বন্ধু—তুহিন, রিফাত আর নাবিল—মনে এমন আনন্দ যে, মনে হচ্ছে আকাশে বেলুন হয়ে উড়ে যাবে!
তাদের তিনজনের স্বভাব তিন রকম।
তুহিন
দেখতে-শুনতে একেবারে সাধারণ, আর মাথার দিক থেকেও সে খুবই সাধারণ—মানে, তার বুদ্ধি মাঝে মাঝে ছুটিতে চলে যায়। সবাই তাকে নিয়ে মজা করলেও তুহিন তা মনেই নেয় না। তার একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য আছে—যে কোনো ভয়ের সময় সে নিজের ভয় না লুকিয়ে বরং এমন অদ্ভুত কথা বলে যে হাসতে হাসতেই ভয় ভুলে যেতে হয়।
রিফাত
বন্ধুদের মধ্যে সবচেয়ে ভীতু। হঠাৎ কোনো শব্দ হলেই “মা গো!” বলে চিৎকার—তারপর কান্না। তার এই কান্নার শব্দের জন্য পুরো পাড়ায় একটাই নাম—“ইতিহাসিক রিফাত রোদন”।
তবে মন খুব ভালো। যদি কেউ পড়ে যায়, প্রথমে সে-ই দৌড়ে আসে—চিৎকার করতে করতে।
নাবিল
তাদের দলের নায়ক। যে-কারণে সবাই তাকে “ক্যাপ্টেন নাবিল” বলে। ভূত, অন্ধকার, পুরনো বাড়ি—কিছুতেই তার ভয় নেই।
তবে একটা জিনিস আছে যেটা দেখলে তার সাহস গলে পানি হয়ে যায়—টিকটিকি।
হ্যাঁ, বড় বাঘের সামনে দাঁড়াতে পারে, কিন্তু ছোট্ট একটা টিকটিকি দেখলে তার শরীর ঠান্ডা বরফ!
ঘোরার পরিকল্পনা
পরীক্ষা শেষ হওয়ার দিন বিকেলে তিনজন চায়ের দোকানে বসে আলোচনা করছিল।
তুহিন: “চলো না কোথাও যাই, পরীক্ষার স্ট্রেস কাটাই! কিন্তু শর্ত—রিফাত রাতে কান্নাকাটি করবে না!”
রিফাত: “আমি তো কান্না করি না! শুধু ভয় পেলে একটু চিৎকার করি… আর একটু পানি পড়ে।”
নাবিল: “চলো ময়মনসিংহ যাই। শশী লজ! ঐতিহাসিক জায়গা। শুনেছি ভেতরে অনেক পুরনো জিনিস আছে।”
তুহিনের চোখ গোল হয়ে গেল।
“শশী লজ? ঐ জায়গায় নাকি পুরনো জমিদাররা ভয়ানক ভয়ানক যন্ত্র রাখত! হাত কাটার যন্ত্র, শিকল, লোহার হ্যান্ডকাফ… সত্যি নাকি?”
নাবিল হাসল। “হ্যাঁ, কিছু সত্যি। শশী লজ তো ছিল ময়মনসিংহের জমিদার শশী কুমার দত্তদের বাসভবন। অনেক বড় রাজবাড়ি ছিল।
সন্তান না হওয়ার দুঃখে নাকি জমিদার বংশের উত্তরাধিকার সংকট হয়েছিল। আবার ওই সময়ে অনেক জমিদার নাকি অত্যাচারও করত।”
রিফাত কাঁপতে কাঁপতে বলল,
“ভাই… সেখানে এসব যন্ত্র থাকলে… আমরা কি ভিতরে যাব নাকি?”
তুহিন ঠোঁট ফুলিয়ে বলল,
“একটা ব্যাপার আছে… এইসব পুরনো বাড়িতে রাতে নাকি কিছু একটা… রয়েই যায়…”
রিফাত লাফ দিয়ে দাঁড়িয়ে গেল—
“কি থাকে?? ভূত??”
নাবিল উঠে দাঁড়াল,
“ভূত–শূত কিছু না। আমরা দিনের বেলা যাব। আর ওসব যন্ত্র এখন শুধু মিউজিয়ামে রাখা, কাউকে কেটে দেয় না।”
তিনজনের পরিকল্পনা পাকা। তারা ঠিক করল, পরের সপ্তাহেই শশী লজে যাবে।
শশী লজ – একটি ছোট ইতিহাস
১৯ শতকের শেষ দিকে শশী কুমার দত্ত তাদের পূর্বপুরুষদের তৈরি বাড়িটি বিস্তৃতি দেন।
একসময় এই লজ ছিল জমিদার পরিবারের ঐশ্বর্যের প্রতীক—নাচঘর, অতিথিশালা, বিশাল বাগান, আর দামী সব শিল্পকর্ম।
কিংবদন্তি আছে,
জমিদার পরিবারে সন্তানের অভাবে উত্তরাধিকার নিয়ে বহু সমস্যা তৈরি হয়।
এছাড়া, তৎকালে অনেক অঞ্চলে জমিদারদের অত্যাচার, কর আদায়, আর বিদ্রোহীদের শাস্তি দেওয়ার নানা যন্ত্র ব্যবহৃত হতো।
মিউজিয়ামে এখনো কিছু ভয়ঙ্কর লোহার যন্ত্র রয়েছে—
কেউ বলে এসব শুধু প্রদর্শনীর জন্য,
আবার কেউ বলে…
যন্ত্রগুলো নাকি রাতে হালকা শব্দ করে।
রওনা দেওয়ার দিন
সকাল সাতটা। তিন বন্ধু রওনা দিল ট্রেনে।
ভ্রমণের আনন্দে সবাই উত্তেজিত।
শশী লজের নাম উচ্চারণ করলেই রিফাতের শরীর কাঁপে।
তুহিন শুধু কথা বলে যায়—
“দেখিস রিফাত, শশী লজে ঢুকতে ঢুকতেই যদি কোনো যন্ত্র ‘খচ্ খচ্’ শব্দ করে…!”
রিফাত আবার চিৎকার জুড়ে দিতে যাচ্ছিল,
ঠিক তখনই—
রহস্যের সূচনা
ট্রেনের জানালার পাশে হঠাৎ একটি পুরনো কাগজ উড়ে এসে নাবিলের কোলে পড়ল।
কাগজে লেখা—
“শশী লজে যেও না…
সেখানে এখনো একজন অপেক্ষা করছে।”
আর নিচে অদ্ভুত একটি চিহ্ন—
যেন কোনো পুরনো বংশের গোপন প্রতীক।
তারা তিনজন একে অপরের দিকে তাকাল।
এটা কে পাঠাল?
কেন পাঠাল?
‘অপেক্ষা করছে’ বলতে কে?
Comments (0)
Login to leave a comment.