পর্ব–২: শশী লজের প্রথম ধাপ

ট্রেনের যাত্রাটা শুরুতে হাসি–আনন্দেই চলছিল। কিন্তু সেই পুরনো কাগজটি পাওয়ার পর থেকে তিনজনের মুখে কেমন অদ্ভুত নীরবতা নেমে এসেছে।

কাগজে মাত্র কয়েকটি লাইন—

“শশী লজে যেও না…

সেখানে এখনো একজন অপেক্ষা করছে।”

আর নিচে সেই রহস্যময় চিহ্ন—অর্ধচন্দ্রের ভেতরে ত্রিভুজ।

রিফাত তো আগেই সিট শক্ত করে ধরে বসেছে।

“ভাই, আমরা কি ফিরে যাবো? প্লিজ? আমার কান্না আসতেছে—চোখ পানি পানি লাগতেছে…”

তুহিন চিবুক চুলকে বলল,

“চেনা কারও লেখা মনে হচ্ছে না। কিন্তু কাগজটা তো খুব পুরনো… যেন বহু বছর আগে কেউ লিখেছিল।”

নাবিল কাগজটা আলতো ভাঁজ করল।

“এটা কেউ মজা করেও দিতে পারে। কিন্তু চিহ্নটা… আমি কোথাও দেখেছি।”

ট্রেনের হুইসেল বাজল।

গন্তব্য কাছাকাছি।


শশী লজের দরজায়

লজে পৌঁছে তিনজনের চোখ কপালে উঠে গেল।

বড় iron gate, তার ওপরে লতাগুল্ম, চারপাশে ঘন নীরবতা।

পাখির ডাকে একটু কাঁপুনি লাগে—এমন পরিবেশ।

রিফাত গেটের দিকে তাকিয়ে বলল,

“ভাই… এখানে বায়ুর গন্ধও পুরনো লাগে কেন?”

নাবিল হাসল,

“এটা ইতিহাসের গন্ধ।”

তুহিন তাড়াতাড়ি বলল,

“ইতিহাসের গন্ধ থাকতে পারে, কিন্তু ভূতের গন্ধ কেমন?”

রিফাত তখনই চিৎকার,

“আআআ… কে জানে??”

গেটের পাশে একজন কেয়ারটেকার দাঁড়িয়ে ছিলেন—

একজন বয়স্ক মানুষ, চোখে মোটা চশমা, মুখে রহস্যময় হাসি।

তিনি বললেন,

“তোমরা—ওই কাগজটা কে দিল?”

তিনজন স্তব্ধ।

কেয়ারটেকার কি দেখেছে কাগজটা?

নাবিল সাবধানে বলল,

“আপনি… জানেন?”

বৃদ্ধ লোক ধীরে ধীরে মাথা নাড়লেন।

“ওটা বহু পুরনো এক সতর্কবার্তা। কিন্তু যারা পড়েও আসে… তাদের ভয় থাকে না।”

তিনি গেট খুলে দিলেন।

“চলো, দেখো তোমাদের সাহস কতটা।”


দর্শন প্রথম: লোহার শাস্তির যন্ত্রঘর

শশী লজের ভেতরটা যেন সময়ের মধ্যে আটকে আছে। উঁচু দেওয়াল, কাঠের দরজা, নাচঘরের ফাঁকা মেঝে, আর ছাদের শিক ঝুলতে থাকা লণ্ঠন।

তাদের প্রথম গন্তব্য—পুরনো শাস্তির যন্ত্রঘর

ভেতরে ঢুকতেই ঠান্ডা হাওয়া লাগল।

চারদিকে লোহার যন্ত্র—

হাত কেটে দেওয়ার কাঠেরা, শিকল, বর্ম ভাঙার হাতুড়ি… এবং মাঝখানে একটা বড় লোহার চক্র।

তুহিন গিলতে গিলতে বলল,

“এগুলো কি… সত্যি ব্যবহার হতো?”

বৃদ্ধ কেয়ারটেকার ধীরে বললেন,

“জমিদারদের সময় ছিল নিষ্ঠুর। এসব দিয়ে বিদ্রোহীদের শাস্তি দিত।”

রিফাত আর দাঁড়াতে পারছিল না—চোখে পানি।

নাবিল তাকিয়ে ছিল একটা যন্ত্রের দিকে—

একটি লোহার হাত-কাটা যন্ত্র।

এর নিচে ছোট একটি কাঠের বোর্ড।

বোর্ডে খোদাই করে লেখা—

“কে তুমি, যে সত্য খুঁজতে এসেছো?”

হঠাৎ…

চারপাশের বাতাস ভারী হয়ে গেল।

দেয়ালের পাশে একটি পুরনো ট্রাঙ্কের ঢাকনা খট করে শব্দ করে উঠল।

রিফাত ঝাঁপিয়ে নাবিলকে জড়িয়ে ধরল,

“ভাই… কিছু নড়ছে! কিছু নড়ছে!!”

তুহিন কেঁপে উঠে বলল,

“এটা কি বাতাসে হয়েছে? নাকি… কেউ আছে?”

নাবিল টর্চ বের করে আলোক ফেলল।

ট্রাঙ্কের ওপর ধুলো—এটা বহুদিন কেউ ছোঁয়নি।

কিন্তু ঢাকনা… যেন কেউ ভেতর থেকে ঠেলে দিয়েছে।

নাবিল ট্রাঙ্কের কাছে এগোল।

রিফাত ফিসফিস করে বলল,

“ভাই… খুলবেন না… ভাই, প্লিজ…”

নাবিল হাত বাড়াতেই—

ট্রাঙ্কের ভেতর থেকে হঠাৎ একটি ছোট কাগজ বেরিয়ে পড়ল।

তিনজন শ্বাস আটকাল।

তুহিন কাগজটা তুলল। কাগজে লেখা—

“দ্বিতীয় চিহ্নটি খুঁজে নাও…

নাচঘরের নিচে।”

আর নিচে আগের মতোই সেই রহস্যময় চিহ্ন—

অর্ধচন্দ্রের ভেতরে ত্রিভুজ

তারা একে অপরের দিকে তাকাল।

বাতাস আরও ঠান্ডা, আরও ভারী।

কেয়ারটেকার তখনই বললেন—

“দেখছি, শশী লজ তোমাদের বেছে নিয়েছে।

সবাইকে তো ডাকে না… শুধু কিছুজনকে ডাকে।”

তিন বন্ধুর মনে একই প্রশ্ন—

শশী লজ তাদের কাছে ঠিক কী চায়?

এই চিহ্নের মানে কী?

নাচঘরের নিচে কি লুকানো আছে?

Comments (0)

Login to leave a comment.